বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবার মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস, রাজনীতি, আবেগ আর অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্তের নতুন অধ্যায়। ২১ বছর পর আবারও যেকোনো প্রতিযোগিতায় দেখা হচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর। আর সব আলো এবারও একজনের ওপরই, লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবার আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলতে চান।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকড় ফুটবলেরও আগে। ১৮৬৭ সালে আর্জেন্টিনায় প্রথম নথিভুক্ত ফুটবল ম্যাচ খেলেছিলেন ব্রিটিশ রেলকর্মীরা। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, রোজারিও সেন্ট্রালের মতো ক্লাব গড়ে ওঠে ব্রিটিশদের হাত ধরে। এমনকি রিভার প্লেট ও বোকা জুনিয়র্সের নামেও ইংরেজি ভাষার প্রভাব রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব বদলে যায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

বিশ্বকাপে প্রথম দেখা হয় ১৯৬২ সালে। তবে সেই ম্যাচ ইতিহাসে খুব বেশি আলোচনায় নেই। চার বছর পর ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালই বদলে দেয় সবকিছু। ওয়েম্বলিতে ১-০ গোলে জেতে ইংল্যান্ড। কিন্তু আর্জেন্টিনায় ম্যাচটি পরিচিত হয়ে যায় শতাব্দীর ডাকাতি নামে। অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে বিতর্কিতভাবে মাঠছাড়া করা, দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকা, রেফারিকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা, ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের সংঘর্ষ, সব মিলিয়ে সেই ম্যাচ দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ককে চিরতরে বদলে দেয়। ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পশু বলেও মন্তব্য করেছিলেন, যা ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এরপর আসে ১৯৮৬। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাচগুলোর একটি। ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে যেন ফুটবল মাঠেই প্রতিশোধ নেয় আর্জেন্টিনা। দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে করেন বিতর্কিত "হ্যান্ড অব গড" গোল। মাত্র চার মিনিট পরই জন্ম দেন "গোল অব দ্য সেঞ্চুরি"। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ১১ সেকেন্ডে পাঁচজনকে কাটিয়ে করা সেই গোল আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে অমর। ইংল্যান্ড একটি গোল শোধ করলেও ২-১ জিতে শেষ পর্যন্ত শিরোপাও জিতে নেয় আর্জেন্টিনা।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও উত্তাপ ছড়ায় এই লড়াই। শুরু থেকেই গোলের বন্যা। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, অ্যালান শিয়ারার, কিশোর মাইকেল ওয়েন আর হাভিয়ের জানেত্তির গোলে নির্ধারিত সময় শেষ হয় ২-২ সমতায়। তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত ছিল ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড। দিয়েগো সিমিওনের উসকানিতে পা তুলে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ইংলিশ তারকাকে। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।

চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। জাপানের সাপ্পোরোতে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টির একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় তারা। মাইকেল ওয়েনকে ফাউল করে পেনাল্টি উপহার দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার মাউরিসিও পোচেত্তিনো। সেই গোলই ইংল্যান্ডকে নকআউট পর্বে তুলেছিল। অন্যদিকে ১৯৬২ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।

এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। ২০০৫ সালের একটি প্রীতি ম্যাচের পর আর দেখা হয়নি এই দুই পরাশক্তির। সেবার ১৮ বছরের এক তরুণ, লিওনেল মেসি, নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতেই পারেননি। আজ সেই মেসিই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে আবার দাঁড়িয়েছেন ইংল্যান্ডের সামনে।

ইতিহাস বলছে, এই লড়াইয়ে কখনও ছিল বিতর্ক, কখনও প্রতিশোধ, কখনও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জাদুকরী মুহূর্ত। তাই আটলান্টার সেমিফাইনাল শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, এটি আরও একটি অধ্যায় যোগ করার অপেক্ষায় থাকা এক মহাকাব্যিক ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন গল্প।