ম্যাচ শুরুর আগের দৃশ্যটা ভাবো, টানেল দিয়ে মেসি, এমবাপ্পে কিংবা রোনালদো মাঠে ঢুকছেন একেকটা ছোট্ট শিশুর হাত ধরে। জাতীয় সংগীত বাজার সময় তারা সামনে দাঁড়িয়ে। এই বাচ্চাদের ইংরেজিতে বলা হয় মাসকট চিলড্রেন। কিন্তু এরা আসে কোথা থেকে, আর এই রীতির পেছনের গল্পটাই–বা কী?

মজার ব্যাপার হলো, এটা খুব পুরোনো রীতি নয়। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে একজন করে শিশু—এই ব্যাপার শুরু হয় ২০০০ সালের ইউরোর সময় থেকে। আর এটাকে বিশ্বজুড়ে অর্থবহ করে তোলে ২০০২ বিশ্বকাপ, তখন ফিফা আর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ মিলে চালু করে ‘সে ইয়েস ফর চিলড্রেন’ প্রচারণা। উদ্দেশ্য ছিল সারা বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়া যে শিশুদের শিক্ষা আর সুস্থ শৈশবের অধিকার আছে। শিশুরা যেন মাঠে নেমে বলত, ‘তোমরা যারা ফুটবল ভালোবাসো, একটা শিশুবান্ধব পৃথিবী গড়ার দায়িত্বও তোমাদের।’

এর পেছনে অবশ্য আরেকটা লুকানো কারণও আছে। আশির দশকে ইউরোপের ফুটবল কুখ্যাত ছিল দর্শকদের মারামারি আর হাঙ্গামার জন্য। শিশুদের মাঠে আনলে খেলাটা হঠাৎ পরিবারবান্ধব, নিরাপদ আর কোমল হয়ে ওঠে—আর খেলোয়াড়েরাও মনে রাখেন, লাখো শিশুর কাছে তাঁরা আদর্শ।

হাইড্রেশন ব্রেক কীভাবে ইংল্যান্ডকে বিভ্রান্ত করছে

এই বাচ্চাদের বাছাই করা হয় কীভাবে? এটার জন্য একটা আলাদা প্রক্রিয়া আছে। বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে সাধারণত সেই উদ্যোগটা হয় পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের লটারি বা কোনো প্রতিযোগিতা থেকে। বহু বছর ধরে এটা চালায় ম্যাকডোনাল্ডস। যারা জেতে, তাদের পুরো খরচ (যাতায়াত, থাকা-খাওয়া) দিয়ে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৪-এর ব্রাজিল বিশ্বকাপে এভাবে ৭০টি দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিশুকে আনা হয়েছিল! আবার কিছু শিশু আসে দাতব্য উদ্যোগে—হয়তো কোনো অসুস্থ শিশুর স্বপ্নপূরণ, কিংবা স্থানীয় কোনো শিশু টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দলকে পুরস্কার হিসেবে। ওদের বয়স সাধারণত ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে থাকে। এই বয়স বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে যেন ওরা নিয়মকানুন আর নির্দেশনা বোঝে, আবার যথেষ্ট ছোটও দেখায় যাতে ‘শিশু’ ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে।

তবে ক্লাব ফুটবলে গল্পটা একটু অন্য রকম, আর কিছুটা বিতর্কিতও। ইংল্যান্ডের অনেক ক্লাব এই সুযোগ প্যাকেজ হিসেবে বিক্রি করে, সেটাও আবার ১৫০ থেকে ৬০০ পাউন্ড পর্যন্ত! এতে জার্সি, ছবি, অটোগ্রাফও মেলে। সমালোচকেরা বলেন, এতে গরিব ঘরের বাচ্চারা ফুটবলের জাদুকরি মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ, যে শিশুটা একবার তার নায়কের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ায়, সেই কয়েক মিনিট সে সারা জীবন মনে রাখে। তার কাছে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা হয়তো কোনো গোল নয়—এই ছোট্ট হাত দিয়ে পছন্দের ফুটবলারকে ছুঁয়ে দেখা।

অবশ্য মাঝেমধ্যে এই রীতির সুন্দর ব্যতিক্রমও দেখা যায়, যেমন নেদারল্যান্ডসের ক্লাব আয়াক্সের খেলোয়াড়েরা একবার মা দিবসে মাঠে ঢুকেছিলেন নিজের মায়েদের হাত ধরে, আবার ব্রাজিলের সাও পাওলো দল ঢুকেছিল রাস্তার কুকুর সঙ্গে নিয়ে, যেটা আসলে ছিল পথকুকুরদের দত্তক নেওয়ার প্রচারণায়!

বাবা নাইজেরিয়ান, মা ফিলিপিনো, স্ত্রী জার্মান; অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক আলাবা যেন বিশ্বনাগরিক