বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ঝুলিতে রয়েছে অবিশ্বাস্য ২০টি রেকর্ড। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সামনে থাকা আরও তিনটি ম্যাচে তিনি আরও কয়েকটি নতুন রেকর্ড গড়ার সুযোগ পেতে পারেন।

আর্জেন্টাইন মহাতারকা বিশ্বকাপে গোল, অ্যাসিস্ট, ম্যাচ সংখ্যা, মাঠে কাটানো মিনিট, সফল ড্রিবলসহ নানা বিভাগে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন।

মেসির বিশ্বকাপ রেকর্ডসমূহ
১. বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা: ২১ গোল
২. বিশ্বকাপে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ড: ২১টি
৩. বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়: ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন
৪. বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে সর্বাধিক গোল: ৭টি
৫. সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড (রোনালদো ও গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে): ৬টি আসর
৬. বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ এবং ৩০ ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করা প্রথম খেলোয়াড়: ৩১ ম্যাচ
৭. বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ম্যাচ: ২৩টি
৮. বিশ্বকাপে সর্বাধিক মিনিট খেলার রেকর্ড: ২,৭৭০ মিনিট
৯. বিশ্বকাপে সর্বাধিক সফল ড্রিবল: ১০৭টি
১০. সবচেয়ে বেশি ভিন্ন বিশ্বকাপ আসরে অ্যাসিস্টের রেকর্ড: ৬টি আসর
১১. একই বিশ্বকাপের প্রতিটি ধাপে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় (জাইরজিনহোর সঙ্গে যৌথভাবে): গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল।
১২. টানা সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল: ৯ ম্যাচ
১৩. টানা সর্বাধিক নকআউট ম্যাচে গোল: ৬ ম্যাচ
১৪. ২০ বছরের আগে, ২০–২৯ বছর বয়সে এবং ৩০ বছরের পর-এই তিন বয়সপর্বেই বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার।
১৫. সবচেয়ে দীর্ঘ সময়জুড়ে বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড: ২০ বছর (২০০৬–২০২৬)
১৬. বিশ্বকাপে সর্বাধিক পেনাল্টি মিস: ৪টি
১৭. একটি বিশ্বকাপ আসরে সর্বাধিক পেনাল্টি মিস: ২টি (২০২৬)
১৮. বিশ্বকাপে সর্বাধিক 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' পুরস্কার: ১৫ বার
১৯. একটি বিশ্বকাপে সর্বাধিক 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' পুরস্কার: ৫ বার (২০২২)
২০. দুইটি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জয়ী একমাত্র ফুটবলার: ২০১৪ ও ২০২২।

লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ফলে তিনিই আর্জেন্টিনা এবং দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসে বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোল করা ফুটবলার। ২০০৬ থেকে ২০২৬-এই ছয়টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১টি।

এই ২১ গোলের মধ্যে ৭টি এসেছে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল ব্রাজিলের রিভেলিনোর, যার ছিল ৫টি দূরপাল্লার গোল।

গোলের আরেকটি রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হন। তখন তার বয়স ছিল ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন। এর আগে রেকর্ডটি ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার সময় তার বয়স ছিল ৩৩ বছর ১৩০ দিন।

মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার, যিনি একটি আসরের প্রতিটি ধাপেই গোল করেছেন। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল-সব ধাপেই গোল করেছিলেন।

ব্রাজিলের জারজিনহো ১৯৭০ বিশ্বকাপেও প্রতিটি ধাপে গোল করেছিলেন। তবে তখন বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর পর্ব ছিল না, তাই সেই রেকর্ড পুরোপুরি মেসির সমান নয়।

২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপ মিলিয়ে মেসি টানা নয়টি ম্যাচে গোল করেছেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড।

মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে গোল করার মাধ্যমে তিনি টানা ছয়টি নকআউট ম্যাচে গোল করার রেকর্ডও গড়েন। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল লিওনিদাস, সারোসি ও ভাভা-এই তিন কিংবদন্তির, যাদের প্রত্যেকেরই ছিল টানা পাঁচটি নকআউট ম্যাচে গোল।

এছাড়া মেসিই ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার, যিনি ২০ বছর বয়সের আগে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সে এবং ৩০ বছর পার হওয়ার পরও বিশ্বকাপে গোল করেছেন। কিংবদন্তি পেলে এই রেকর্ড স্পর্শ করার খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন, কিন্তু মাত্র চার মাসের ব্যবধানে তা করতে পারেননি।

মেসির আরেকটি অনন্য কীর্তি হলো বিশ্বকাপে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়জুড়ে গোল করার রেকর্ড। ২০০৬ সালে প্রথম গোল এবং ২০২৬ সালে সর্বশেষ গোল-দুইয়ের ব্যবধান ২০ বছরেরও বেশি। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যার ব্যবধান প্রায় ১৬ বছর ৬ মাস।

লিওনেল মেসি বর্তমানে রোনালদো এবং গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি (৬টি) বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডের মালিক। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল আন্তোনিও কারবাহাল, লোথার ম্যাথাউস, রাফা মার্কেজ এবং আন্দ্রেস গুয়ার্দাদোর; যাদের প্রত্যেকেই খেলেছিলেন পাঁচটি বিশ্বকাপ।

ড্রিবলের দিক থেকেও মেসি ইতিহাসের সেরা। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনি ১০৭টি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন, যা অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে বেশি। শুধু ২০২৬ বিশ্বকাপেই তিনি সফলভাবে ২৭টি ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন।

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি একাই ৪৬টি সফল ড্রিবল করেছিলেন, যা এক আসরে তৃতীয় সর্বোচ্চ। তার ওপরে আছেন কেবল দুইজন কিংবদন্তি-জারজিনহো, যিনি ১৯৭০ বিশ্বকাপে ৪৭টি ড্রিবল করেছিলেন এবং দিয়েগো ম্যারাডোনা, যিনি ১৯৮৬ বিশ্বকাপে করেছিলেন ৫৩টি।

মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার। তিনি খেলেছেন ৩১টি ম্যাচ এবং জিতেছেন ২১টি, যা এটিও একটি রেকর্ড। তিনিই প্রথম ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপে ৩০ ম্যাচের গণ্ডি অতিক্রম করেছেন।

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে তিনি বিশ্বকাপে ২৩টি ম্যাচ খেলেছেন, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ। তার পরে আছেন মেক্সিকোর রাফা মার্কেজ (১৭ ম্যাচ) এবং আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা (১৬ ম্যাচ)।

মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মিনিট মাঠে থাকা ফুটবলারও। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তার মোট খেলার সময় দাঁড়ায় ২,৭৭০ মিনিট। এর মাধ্যমে তিনি ইতালির পাওলো মালদিনির ২,২১৭ মিনিটের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দেন।

অ্যাসিস্টের ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য। মেসিই একমাত্র ফুটবলার, যিনি পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করেছেন। এর আগে পেলে, গ্রেগরজ লাতো, দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ডেভিড বেকহ্যাম তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করেছিলেন।

এছাড়া বিশ্বকাপে 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' পুরস্কারও সবচেয়ে বেশি জিতেছেন মেসি। এখন পর্যন্ত তিনি ১৫ বার এই পুরস্কার পেয়েছেন। আর এক আসরে ৪ বার 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ' হওয়ার রেকর্ডটি তিনি ভাগাভাগি করছেন নেদারল্যান্ডসের ওয়েসলি স্নেইডার-এর সঙ্গে।

বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল দুইবার জেতা একমাত্র ফুটবলারও মেসি। তিনি এই সম্মান অর্জন করেন ২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপে।

বিশ্বকাপে এখনও মেসির সামনে আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ার সুযোগ রয়েছে।

মেসির সামনে যে চারটি রেকর্ড
১. একটি বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের রেকর্ড: ফ্রান্সের জ্যাঁ ফঁতেনের ১৩ গোল স্পর্শ বা ভাঙার সুযোগ।

২. বিশ্বকাপে দুটি হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড: আর একটি হ্যাটট্রিক করলে তিনি সান্দোর কচিস, জ্যাঁ ফঁতেন, গার্ড মুলার এবং গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার পাশে নাম লেখাবেন।

৩. বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক গোল্ডেন বুটজয়ী হওয়ার সুযোগ: বর্তমানে এই রেকর্ডটি ক্রোয়েশিয়ার দাভর শুকের-এর দখলে। তিনি ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ৩০ বছর বয়সে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন।

৪. সবচেয়ে বেশি বয়সে দুইবার বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার হওয়ার সুযোগ: বর্তমানে এই রেকর্ডটি ব্রাজিলের নিলতন সান্তোস-এর, যিনি ১৯৬২ সালে ৩৭ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতেছিলেন (প্রথমটি ১৯৫৮ সালে)।

আরআর/এমএমআর