‘লিবার্তে, এগালিতে, ফ্রাতের্নেতে’। ফ্রান্সের এই তিন জাতীয় মূলমন্ত্রের বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘স্বাধীনতা, সমতা ও একতা’। ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের পর ফ্রান্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তিন মূলমন্ত্র বদলে হয়ে যায় ‘স্বাধীনতা, সমতা ও এমবাপ্পে’। আর এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ত্রয়ী যেমন খেলছে, তাতে আপনি চাইলে এই মূলমন্ত্রটি বদলে ‘এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও ওলিসে’ করে ফেলতে পারেন!  

এই বিশ্বকাপে ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশের’ ফ্রান্সের খেলা মানেই  কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের সবুজ মাঠে শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো চিত্রকর্ম। বিশ্বকাপে এই তিন জনের অবদান দেখুন—এখন পর্যন্ত এমবাপ্পে ৮টি গোল করে ফেলেছেন, সঙ্গে ৩টি অ্যাসিস্ট। বেশি অ্যাসিস্টের সুবাদে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে। পরশু মরক্কোর বিপক্ষে দেম্বেলেও করে ফেলেছেন টুর্নামেন্টে নিজের পঞ্চম গোল, বিশ্বকাপে ফ্রান্সের একমাত্র হ্যাটট্রিকটি ব্যালন ডি’অরজয়ী ফরোয়ার্ডেরই। ওলিসের এখনো গোল না পাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে রহস্যও বলতে পারেন। তবে পাঁচ গোল করিয়ে অ্যাসিস্টের তালিকায় তিনি আবার সবার ওপরে। সামনে হাতছানি দিচ্ছে কিংবদন্তি পেলের এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ছয় অ্যাসিস্টের কীর্তি। এর বাইরেও তিনজনের ‘টেলিপ্যাথিক’ বোঝাপড়াটা এমনই দুর্দান্ত যে কে বলবে তিনজন এই প্রথম বড় কোনো আসরে একসঙ্গে খেলছেন!  

অনুশীলনে ফ্রান্স দল
কোর্তোয়া বললেন চ্যাম্পিয়ন হবে ফ্রান্স বা স্পেন, রোমেরো বললেন ‘কান দিই না’

এক বিশ্বকাপে একই দলের দুজনের অন্তত পাঁচ গোল করার আরেকটা কীর্তিও মনে করিয়ে দিয়েছেন এমবাপ্পে ও দেম্বেলে। সর্বশেষ ২০০২ বিশ্বকাপে যেটি ছিল দুই ব্রাজিলিয়ান গ্রেট রোনালদো ও রিভালদোর। কাকতালীয়ই বটে, এমবাপ্পে-দেম্বেলের মতো রোনালদো-রিভালদোর গোলও ছিল ৮টি ও ৫টি। এবার ওলিসেকে যদি সেই বিশ্বকাপের তরুণ রোনালদিনিওর সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে এই ত্রয়ী ব্রাজিলের সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে পারে।

তুলনাটা এখনই বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে, ফ্রান্সের এই ত্রয়ী তো এখনো বিশ্বকাপ জেতা থেকে আরও দুই ম্যাচ দূরে। কিন্তু একটা জায়গায় ব্রাজিলের সেই ‘থ্রি আর’ কেও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। ফ্রান্সের তিনজনের এই বিশ্বকাপে মোট গোল ও অ্যাসিস্ট হয়ে গেছে ২৩টি, ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেই তিনজনের যা ছিল মোট ২০টি। সেটি আরও বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ ফ্রান্সের এই তিনজনের সামনে।

প্রতিপক্ষ রক্ষণের নাভিশ্বাস ছড়ানো এই তিনজনকে নিয়ে ম্যাচের পর তাই স্তুতি গাইছেন সবাই। ফ্রান্স-নরওয়ে ম্যাচের পর তাদের কোচ স্তালে সলবাকেন যেমন ঘোষণা করে দিয়েছেন, ‘ফ্রান্সের আক্রমণ সন্দেহাতীতভাবে এই বিশ্বকাপের সেরা।’ এই তিনজনের সঙ্গে দেজিরে দুয়ের নাম যোগ করে সলবাকেন বলেছিলেন, আক্রমণে বিশ্বকাপে এই চারজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সুইডেন কোচ গ্রাহাম পটার যেমন বলেছিলেন, ফ্রান্সের এই আক্রমণকে কীভাবে থামানো সম্ভব, তিনি জানেন না! আর এই সতীর্থদের নিয়ে ফ্রান্সেরই আক্রমণভাগের আরেক সদস্য ব্রাডলি বারকোলা বলেছেন, এই তিনজনের সঙ্গে খেলাটাই অবিশ্বাস্য অনুভূতি।  

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ত্রয়ীর জায়গা কোথায়? ফ্রান্সেরই ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী দলে এই ত্রয়ীর মধ্যে শুধু এমবাপ্পে ছিলেন, সেবার আক্রমণের বাকি দুজন ছিলেন গ্রিজমান ও জিরু। এমবাপ্পে ও গ্রিজমানময় সেই টুর্নামেন্টে জিরু অবশ্য কিছুটা আড়ালেই ছিলেন। অন্যদিকে ১৯৯৮ ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলে সেই অর্থে কোনো ত্রয়ী ছিলেন না। সেবার ফ্রান্সের হয়ে ফাইনালে তাদের সর্বোচ্চ স্কোরার থিয়েরি অঁরিই প্রথম একাদশে খেলেননি। আর ষাট ও সত্তরের দশকে ফুটবলেও চার, এমনকি পাঁচজন ফরোয়ার্ডও একসঙ্গে খেলতেন। সত্তরের ব্রাজিল দলে যেমন পেলে-তোস্তাও-জেয়ারজিনহো ও রিভেলিনো এই চারজনের নাম একসঙ্গেই নিতে হয়।    

ক্লাব ফুটবলে ত্রয়ী বলতে বার্সেলোনায় মেসি-নেইমার-সুয়ারেজের এমএসএন বা রিয়াল মাদ্রিদের বেল-বেনজেমা-রোনালদোর বিবিসি ত্রয়ীর নাম আসে। এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে যেভাবে খেলছেন, তাতে এই দুই ত্রয়ীর স্মৃতিও মনে পড়ে যেতে পারে আপনার!