ব্রাজিল ফুটবলের চিরন্তন পরাশক্তি হলেও বর্তমান জাপান দল যেকোনো বড় দলের জন্যই এক আতঙ্কের নাম। এর পেছনে রয়েছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি এবং সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনা। ২০০৫ সালে জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন-জেএফএ তাদের বিখ্যাত ‘১০০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা করে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিলো ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ জয়। এটি কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং ধাপে ধাপে অর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য।
তৃণমূলের উন্নয়নে ২০৫০ সালের মধ্যে সারা দেশে ১ কোটি ফুটবলপ্রেমী ও সক্রিয় খেলোয়াড় তৈরি করতে চায় তারা। জাপানের প্রতিটি অঞ্চলে বিশ্বমানের ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে ৮ থেকে ১০ বছর বয়স থেকেই শিশুদের বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পাসিং, পজিশনাল ফুটবল এবং সঠিক সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শেখানো হয়।
শুধু ঘরোয়া জে লিগের ওপর নির্ভর না করে তরুণ প্রতিভাদের ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে পাঠানোর নীতি গ্রহণ করে জাপান। আজকের তাকেফুসা কুবো, কাওরু মিতোমমা, তাকুমি মিনামিননো, রিতসু দোয়ান এবং ওয়াতারু এন্দোর মতো বিশ্বমানের তারকারা এই দূরদর্শী নীতিরই সফল ফসল।
বয়সভিত্তিক দল থেকেই আধুনিক ভিডিও অ্যানালাইসিস, জিপিএস ট্র্যাকিং, স্পোর্টস সায়েন্স, পারফরম্যান্স ডেটা এবং পুষ্টিবিদ ও ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীদের সেবা নিশ্চিত করা হয় ২০৫০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে।
জাপানের আধুনিক ও ক্ষুরধার ট্যাকটিকাল দর্শন মাঠে জাপানের খেলার ধরণ এখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এবং দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের উদাহরণ। ব্রাজিলের বিপক্ষে তাদের মূল শক্তি হবে এই ট্যাকটিকাল দিকগুলো।
বিল্ডআপ এবং নিখুঁত পাসিং জাপানের ফুটবলাররা নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল দেয়া-নেয়া করে আক্রমণভাগ পর্যন্ত নিয়ে যায়। সুইডেনের বিপক্ষে তাদের ১০টি পাসের সমন্বয়ে করা গোলটি এর নিখুঁত প্রমাণ। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে মাঝমাঠ, সেখান থেকে রাইট উইং হয়ে লম্বা পাসে লেফট উইং এবং পুনরায় ছোট ছোট নিখুঁত পাসে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে ডেইজেন মেইডার গোল করাটা দেখায় যে তারা বল পজিশনে কতটা পরিপক্ক।
উচ্চ-তীব্রতার প্রেসিং ও বিরতিহীন দৌড় জাপানি ফুটবলারদের ফুসফুসের ক্ষমতা এবং স্ট্যামিনা অবিশ্বাস্য। তারা পুরো ৯০ মিনিট ধরে হাই-ইন্টেন্স প্রেসিং ধরে রাখতে পারে। প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকা মাত্রই তারা দলগতভাবে চেপে ধরে। এই অনবরত অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট ও গতিশীলতা ব্রাজিলের মতো দলকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিতে পারে।
কৌশলগত নমনীয়তা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যেভাবে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের ফরম্যাশন বদলে ফেলেছিল, জাপানের কোচ হাজিমে মরিয়াসু ঠিক সেই পথেই হাঁটছেন। তারা কোনো নির্দিষ্ট ছকে বন্দী থাকে না। ম্যাচের পেন্ডুলাম কোন দিকে দুলছে তা দেখে মাঝমাঠেই ফরম্যাশন বদলে ফেলার দারুণ দক্ষতা রয়েছে মরিয়াসুর। মাঠে কোচের চিরচেনা নোটবুক বা নাম্বার প্রদর্শন তারই প্রমাণ।
ব্রাজিল বনাম জাপান ব্রাজিল সাধারণত কিছুটা ছন্দময় এবং ধীরস্থিরভাবে আক্রমণ গড়ে তুলতে পছন্দ করে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো অতিমানবীয় গতির উইঙ্গার থাকলেও দলগত গতির দিক থেকে জাপান তাদের কঠিন পরীক্ষা নেবে।
ম্যাচটিতে মূল লড়াই হবে ব্রাজিলের শারীরিক উচ্চতা ও একক নৈপুণ্যের বনাম জাপানের দলীয় গতি ও নিখুঁত শৃঙ্খলার। একদিকে থাকবে ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবল, অন্যদিকে থাকবে জাপানের ১০০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের অদম্য ক্ষুধা।








