বৃষ্টির দিনে বাইরে থাকার সময় মুখে বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে মনে হতে পারে এই পানি ঘরের ফিল্টারের পানির মতোই পরিষ্কার। কিন্তু আসলে তা নয়। আকাশ থেকে পড়ার সময় বৃষ্টির পানিতে বাতাসে থাকা ধূলিকণা, ধোঁয়া ও জীবাণু মিশে যায়। অন্যদিকে আমাদের ঘরের খাওয়ার পানি ফিল্টার ও ফুটিয়ে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ করে নেওয়া হয় বলে তাতে এসব ময়লা থাকার সুযোগ থাকে না। তাহলে কি বৃষ্টির পানি জমিয়ে সরাসরি পান করা ঠিক না?

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংস্থা ‘সিডিসি’ বলছে, একদমই পান করা ঠিক না। কারণ, মেঘ থেকে যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন বাতাসে থাকা নানা রকম ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ধুলাবালু আর ধোঁয়া পানির সঙ্গে মিশে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যখন আমরা ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে বৃষ্টির পানি বালতি বা ট্যাংকে জমাই। ছাদে পাখির মল বা অন্য ময়লা থাকলে তা পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়।

আবার ছাদ বা পানির পাইপ যদি পুরোনো হয়, তবে সেখান থেকে সিসা বা তামার মতো বিষাক্ত ধাতুও পানিতে চলে আসতে পারে। আর খোলা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখলে তো কথাই নেই। সেখানে মশা ডিম পাড়বে, আবার গাছের শুকনো পাতা পচে পানি নষ্ট হবে। এসব বিপদের কারণে বিজ্ঞানীরা বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করতে বারণ করেন। তবে এই পানি গাছে দেওয়া যায়।

বৃষ্টি এলে ঘুম ঘুম পায় কেন

অবশ্য কোন এলাকায় থাকো, তার ওপর পানির দূষণ অনেকটাই নির্ভর করে। শহরের বাতাসে ধোঁয়া বেশি থাকায় সেখানকার বৃষ্টির পানি বেশি নোংরা হয়। তবে একদম আধুনিক ও পরিষ্কার উপায়ে পানি জমিয়ে, তা ভালোভাবে ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে জীবাণুমুক্ত করা হলে বেশির ভাগ ময়লাই দূর করা সম্ভব। আর এ কারণেই বৃষ্টির পানি খাওয়া যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে অনেকের মনেই খটকা থাকে।

আধুনিক যুগে মানুষের তৈরি রাসায়নিকের কারণে বৃষ্টির পানি পানের সঙ্গে যোগ হয়েছে এক নতুন বড় ঝুঁকি। ২০২২ সালের আগস্টে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে বৃষ্টির পানিতে বিষাক্ত ‘পিএফএএস’ (PFAS)-এর পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এই গবেষণার ফলাফল বলে, বৃষ্টির পানি সরাসরি বা অপরিশোধিত অবস্থায় পান করা এখন একেবারেই অনিরাপদ।

গবেষণার প্রধান লেখক ও সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রসায়নবিদ ইয়ান কাজিনস। তিনি জানান, পিএফএএস হলো মানুষের তৈরি ১ হাজার ৪০০টির বেশি রাসায়নিক উপাদানের একটি মিশ্রণ। এগুলো সাধারণত ওয়াটারপ্রুফ পোশাক, ননস্টিক রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, খাবারের প্যাকেট এবং কৃত্রিম ঘাসের মতো জিনিস তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তবে এর মধ্যে ৪টি উপাদান মানুষের শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই রাসায়নিকগুলো অত্যন্ত বিষাক্ত। এগুলো শরীরে প্রবেশ করলে ক্যানসার, লিভার ও থাইরয়েডের রোগ এবং শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি এর কারণে শিশুদের টিকার কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে।

মেঘ থেকে বৃষ্টি জলপ্রপাতের মতো না পরে ফোঁটায় ফোঁটায় পরে কেন

এই মারাত্মক ক্ষতির কারণে গত ২০–৩০ বছরে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এই রাসায়নিকগুলো নিষিদ্ধ বা এর ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। এমনকি আমেরিকার পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) নিরাপদ পানির জন্য এই রাসায়নিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা আগের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ কোটি গুণ কমিয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞানী ইয়ান কাজিন্স জানান, পিএফএএস রাসায়নিকগুলো সহজে ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যায় না। এর মানে হলো এগুলো তৈরি হওয়ার বহু বছর পরও পরিবেশে টিকে থাকে এবং আগের মতোই বিষাক্ত থেকে যায়। এই দীর্ঘস্থায়ী স্বভাবের কারণেই বিজ্ঞানীরা একে চিরস্থায়ী রাসায়নিক বলে ডাকেন।

টিনের চাল বেয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি

এই গবেষণায় গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে বৃষ্টির পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছেন। পৃথিবীর সব জায়গার বৃষ্টির পানিতেই এখনো প্রচুর পরিমাণে পিএফএএস মিশে আছে। এই রাসায়নিকের পরিমাণ আমেরিকার পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) এবং অন্যান্য দেশের নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা আশা করেছিলেন, বিভিন্ন দেশে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আসায় এত দিনে হয়তো বৃষ্টির পানিতে পিএফএএসের পরিমাণ কমতে শুরু করবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। গবেষকেরা মনে করেন, এই রাসায়নিকের কারণে আমরা ইতিমধ্যেই পৃথিবীর নিরাপদ সীমার বাইরে চলে গেছি, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বড় হুমকি।

অবাক করা বিষয় হলো, তিব্বত মালভূমি এবং অ্যান্টার্কটিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রত্যন্ত ও নির্জন এলাকার বৃষ্টির পানিতেও বিষাক্ত পিএফওএর মাত্রা ইপিএর নিরাপদ সীমার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

বৃষ্টি, তোমাকে ভালোবাসি

বিশ্বের এত দূরের ও দুর্গম অঞ্চলে কীভাবে এই রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়ে গবেষকেরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তবে তাঁদের ধারণা, সমুদ্রের পানিতে মিশে থাকা পিএফএএস পানিকণার মাধ্যমে বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যাচ্ছে। পরে তা মেঘের সঙ্গে ভেসে দূরদূরান্তে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ছে। ভবিষ্যতের গবেষণায় তারা এই ধারণা পরীক্ষা করে দেখবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ল্যান্ডফিল বা ময়লা ফেলার স্থান থেকেও এই রাসায়নিক চুইয়ে পরিবেশে মিশে যেতে পারে।

বিশ্বজুড়ে পিএফএএস–সমৃদ্ধ এই বৃষ্টির পানি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, সেখানকার লাখ লাখ মানুষের পানির একমাত্র উৎস হিসেবে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে। তবে উন্নত দেশগুলোর কিছু অঞ্চলেও যেমন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়, বৃষ্টির পানি পান করার চল এখনো বেশ জনপ্রিয়।

চিন্তার বিষয় হলো, বৃষ্টির পানি ফুটিয়ে বা সাধারণ উপায়ে শোধন করলেও তা থেকে পিএফএএস পুরোপুরি দূর করা যায় না। এমনকি আমাদের ঘরের পানি এবং বোতলজাত পানিতেও খুব সামান্য পরিমাণে পিএফএএস পাওয়া যেতে পারে। যদিও তা সাধারণত নিরাপদ সীমার ভেতরেই থাকে। এই রাসায়নিকগুলো একসময় নদী-নালা হয়ে গভীর সমুদ্রে চলে গেলে ধীরে ধীরে এর ঘনত্ব ও ক্ষতিকর প্রভাব কমে আসবে। তবে এটি অত্যন্ত ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া, যা সফল হতে আরও বহু দশক সময় লেগে যেতে পারে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্সবিশ্বের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ কোনটি