মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে ‘আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের’ প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বাতিল, বন্দর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দলটি।

আজ বুধবার সকালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচিতে এসব দাবি জানান দলটির নেতারা।

বেলা ১১টায় সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সামনে থেকে লাল পতাকার মিছিল বের করেন দলের নেতারা। মিছিলটি জাতীয় প্রেসক্লাব, তোপখানা রোড, পল্টন মোড়, নূর হোসেন স্কয়ার ও গোলাপ শাহ মাজার এলাকা প্রদক্ষিণ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী বজলুর রশীদ ফিরোজ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য জনার্দন দত্ত নান্টু, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জুলফিকার আলী ও ডা. মনীষা চক্রবর্তী এবং কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য খালেকুজ্জামান লিপন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ বারবার শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ–অভ্যুত্থানের পথ বেছে নিয়েছে। ১৯৫২,১৯৬২ ও ১৯৬৯ সালের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার শ্রমিক-কৃষকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণ–অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে তারা উল্লেখ করেন।

নেতারা বলেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর জনগণের মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের আশা সৃষ্টি হলেও দুই বছর পর দেশের পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার বিপরীত দিকে চলে গেছে।

তাদের অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী একটি বাণিজ্যচুক্তি করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারও বহাল রেখেছে। এই চুক্তি দেশের শিল্প, কৃষি, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর হবে।

বক্তারা আরও অভিযোগ করে বলেন, সরকার একদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলএনজি আমদানির পথে হাঁটছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর এবং চট্টগ্রামের নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন তারা।

সমাবেশে ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করা হয়।

বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত ও মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির তৎপরতা এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে তারা এসব অপতৎপরতা প্রতিরোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের চেতনা দেশ বিক্রি করার চেতনা নয়। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ জুলাইয়ের শহীদরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। এ জন্য বাসদসহ বামপন্থী শক্তিকে আরও সুসংগঠিত করে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে নতুন গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।