বাংলাদেশ বিমানকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর নতুন নয়; তবে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থায় দুর্নীতিবাজদের আড়াল করার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা চরম উদ্বেগজনক। সম্প্রতি বিমানের কুয়েত স্টেশনে এক্সেস ব্যাগেজ চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য এই আড়াল করার সংস্কৃতিই দায়ী। অনিয়মের স্পষ্ট তথ্য থাকার পরও তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ীদের চিহ্নিত না করে ‘তদন্তের সীমাবদ্ধতা’র অজুহাত দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কুয়েতের বিতর্কিত স্টেশন ম্যানেজারকে রক্ষা করতেই এমন একটি কৌশলী ও দায়সারা প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অতিরিক্ত ব্যাগেজের অর্থ লোপাটের বিষয়ে বিমানের নিজস্ব নিরাপত্তা বিভাগ যখন অকাট্য প্রমাণ হাতে পেয়েছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই আশা করা গিয়েছিল, একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উলটো চিত্র। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, তদন্ত কমিটির এই গাফিলতি হয় চরম অদক্ষতার প্রমাণ, নয়তো সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধীকে বাঁচানোর অপচেষ্টা। বস্তুত বিদেশি স্টেশনগুলোতে ব্যাগেজ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাৎ এখন ওপেন সিক্রেট। নিরাপত্তা বিভাগের ঝটিকা অভিযানে যে সত্য বেরিয়ে এসেছিল, তদন্ত প্রতিবেদনে তার প্রতিফলন না থাকা অত্যন্ত রহস্যজনক। বিমানের মতো একটি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থায় এ ধরনের দায়িত্বহীন তদন্ত কেবল আর্থিক ক্ষতিই বাড়ায় না, বরং বিদেশি স্টেশনগুলোতে দুর্নীতির শিকড়কে আরও গভীরে নিয়ে যায়। যখন দুর্নীতিবাজরা বুঝতে পারে, শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা প্রভাবের জোরে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব, তখন অনিয়মের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে বিমানের আয় যেমন তলানিতে ঠেকছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
আমরা মনে করি, কুয়েত স্টেশনের এই দুর্নীতির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনটি অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, যারা তদন্তের নামে এই ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা জরুরি। বিমানকে লোকসানের বৃত্ত এবং দুর্নীতির পাঁক থেকে মুক্ত করতে হলে ‘শর্ষের ভেতরের ভূত’ তাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান না নিলে বিমানের আর্থিক লুটপাট ও অনিয়ম কখনোই বন্ধ হবে না।








