নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আবারো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। গত এক মাসের ব্যবধানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেড়েছে চাল ও মুরগির দাম।
চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়া এবং বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে চালের দাম কেজিপ্রতি গড়ে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পোলাওয়ের চালের দাম, যা এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এদিকে, বেতন না বাড়ায় ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা।
শুক্রবার (৩ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা এ চিত্র দেখা গেছে।
চাল ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ২ টাকা বেড়ে এখন বাজারে নাজিরশাইল ও মিনিকেটের মতো সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮৫ টাকা কেজিতে। পাইজাম, ব্রি-২৮-এর মতো মাঝারি চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়ে মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকায়। স্বর্নাগুটি বা মোটা চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বেড়েছে। এই চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে।
তারা জানান, গত এক মাসের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিনিগুঁড়া বা পোলাওয়ের চালের দাম। কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে এখন প্রতিকেজি খোলা পোলাওয়ের চাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর তথ্য মতে, এক মাসের ব্যবধানে চিকন চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ, মাঝারি মানের চিকন চালের দাম প্রতি কেজি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
খামার ও পাইকারি পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঘাটতির প্রভাবে বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে মুরগির দাম। এখন প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে আকারভেদে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়।
সরবরাহ ও উৎপাদন ভালো থাকায় কমেছে ডিমের দাম। গত মাসে ডিম বিক্রি হয়েছিল ১৪০ টাকা ডজন। এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা ডজন।
এ সপ্তাহে স্থিতিশীল রয়েছে সবজির দাম। এখন বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থাকে ৮০ টাকা দরে। দেশি শশা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা, পটল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, টমেটো ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচমরিচ ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ টাকা, ধুন্দুল ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। প্রতিপিস জালি কুমড়া ও লাউ আকারভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের।
এছাড়া মুদি বাজারে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এখন প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ মানভেদে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, রসুন (দেশি) ১০০ থেকে ১৪০ টাকা, দেশি আদা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য মতে, এক মাস আগে প্রতিকেজি দেশি রসুনের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে মাছের দাম সামান্য বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় মাছের সরবরাহ কিছুটা কম। এখন বাজারে মাঝারি আকারের চাষের রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। চাষের পাঙাস আকার অনুযায়ী কেজি ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, আকারভেদে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি আকারের কৈ মাছ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
আকারভেদে দেশি শিং ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বড় সাইজের পাবদা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, দেশি পাঁচমেশালি ছোট মাছ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মলা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, টেংরা ৬০০ টাকা, আকারভেদে রূপচাঁদা ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা, বোয়াল আকার অনুযায়ী ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ৪০০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশ ১২০০ টাকা এবং চট্টগ্রামের ইলিশ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
যা বলছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে সপ্তাহিক বাজার করতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সাফায়াত জামিল। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে সংসারের খরচ ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। আমাদের বেতন একই জায়গায় আছে। চাল, মুরগি ও ডালসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় কয়েক দিনের বেশি চলে না। পরিবারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে কারো ভাবার সময় নেই। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা বেসরকারি চাকরিজীবীরা অবহেলিত।”
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সপ্তাহিক বাজার করতে আসা আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী সুরাইয়া আক্তার বিথি বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি খাতে কর্মরতদের জন্য কোনো সুখবর নেই। বাসাভাড়া, সন্তানের পড়ালেখা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়েছে। মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক সময় ধার করে চলতে হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।"
একই বাজারের চাল বিক্রেতা মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “চালের দাম বাড়ানোর পেছনে খুচরা ব্যবসায়ীদের কোনো ভূমিকা নেই। আমরা যে দামে পাইকারি বাজার থেকে চাল কিনে আনি, সেই হিসাবেই বিক্রি করি। সম্প্রতি পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে, তাই খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। দাম বাড়ায় ক্রেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করলেও আমাদের কিছু করার থাকে না।"
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুরগি বিক্রেতা হুমায়ূন বেপারি বলেন, “খামার পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। এছাড়া, চাহিদার তুলনায় সরবরাহও কম। আমরা আগেভাগে অর্ডার দিলেও অনেক সময় প্রয়োজন অনুযায়ী মুরগি পাচ্ছি না। ফলে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এবং সেই প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। বিক্রেতা হিসেবে আমরাও অস্বস্তিতে আছি, কারণ দাম বাড়লে ক্রেতা কমে যায়।”








