তীব্র গরমের সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চাঁদপুরজুড়ে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকদিন ধরেই বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়ম ও লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, চাঁদপুরের আটটি উপজেলাতেই কমবেশি লোডশেডিং হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন হাইমচর, মতলব উত্তর, ফরিদগঞ্জ ও কচুয়ার বাসিন্দারা। জেলা শহরে অন্তত ৫-৬ বার লোডশেডিং হলেও বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে স্বাভাবিক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। অনেক এলাকায় দিনে এবং রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের কিছুটা ঘাটতি এবং অতিরিক্ত লোডের কারণে সাময়িকভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকার কারণে। তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের এই দুর্ভোগ থেকে দ্রুত পরিত্রাণ চান চাঁদপুরবাসী।
হাইমচর
হাইমচরে মূলত দিনের বেলাতেই লোডশেডিংয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহে সবচেয়ে বেশি বিঘ্ন ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে ভোগান্তির বিষয় হলো, একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা দ্রুত ফিরে আসে না। অনেক ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়।
হাইমচর উপজেলার বাসিন্দা বশির হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে বিদ্যুৎ যায় না, বরং বলা হয় বিদ্যুৎ আসে। দিন-রাত মিলিয়ে অসংখ্যবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অনেক সময় ৮ থেকে ১০ বার কিংবা তারও বেশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আবার আসবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় বা নিশ্চয়তা থাকে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। রাতের বেলায় ঘুমানো যাচ্ছে না, আবার দিনের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আমরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছি।
হাইমচর পল্লী বিদ্যুতের সাব-জোনাল অফিসের এজিএম রোকসানা আক্তার বলেন, ‘হাইমচরে বিদ্যুতের চাহিদা সময়ভেদে পরিবর্তিত হয়। দিনের চাহিদা এক রকম থাকে, আবার রাতের বেলায় তা আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে এলাকায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। হাইমচরে সাধারণত ১০ থেকে ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও আমরা তার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছি। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেই অনুযায়ী সরবরাহ করছি। দিনে বা রাতে কতবার বিদ্যুৎ যাবে, সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
মতলব উত্তর
গত একমাস ধরে মতলব উত্তরে বিদ্যুৎ বিপর্যয় চলছে। দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে উপজেলায়। তবে পৌর এলাকা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে লোডশেডিং হয় বেশি।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতাধীন মতলব উত্তর জোনাল অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার আবাসিক, ২০ হাজার বাণিজ্যিক এবং ৪০০ শিল্প গ্রাহক রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, অন্তত ১৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উপজেলা প্রশাসন, থানা, নৌ-পুলিশ ফাঁড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কৃষি খাতেও মতলব উত্তরের ভুমিকা ব্যাপক। অথচ বড় উপজেলা হিসেবে সেই অনুপাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে না এ উপজেলাটি।
শিক্ষার্থী পারভেজ রহমান বলেন, ‘ক্লাস চলাকালীন সময়ে ন্যূনতম ২-৩ বার বিদ্যুৎ যায়। এতে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে তীব্র গরম অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং। ফলে ক্লাসে থাকা খুবই কষ্টের। আবার স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেও দেখি বিদ্যুতের একই সমস্যা। রাতে ঘুমানোর সময় কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়।’
মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এম ডি ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘মতলব উত্তর উপজেলায় ২৭-২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন কিন্তু আমরা পাচ্ছি তার অর্ধেক। যার কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পেলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব নয়।’

ফরিদগঞ্জ
ফরিদগঞ্জ উপজেলায়ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির একই চিত্র। দিনরাত মিলিয়ে ৭-৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ গেলে কোন সময় এক ঘন্টা আবার কোন সময় ২ ঘণ্টায়ও আসে না। উপজেলায় দুইটি সাব স্টেশন রয়েছে একটি কামতা আরেকটি ফরিদগঞ্জে। পৃথক দুটি বিদ্যুতের সাব স্টেশন থেকে আলাদাভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
ফরিদগঞ্জের রূপসায় দক্ষিণ ইউনিয়নের ব্যবসায়ী বারেক গাজী বলেন, ‘দিনে এবং রাতে বারবার বিদ্যুৎ যায়। ঘরে থাকা দায় হয়ে গেছে। বিশেষ করে যারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাই, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ফ্রিজে থাকা মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসা করা যাবে না।’
এ বিষয়ে কামতা ও ফরিদগঞ্জ বিদ্যুতের জোনাল অফিসের কোন কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।
কচুয়া
কচুয়া উপজেলায়ও বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শনি, রবি ও সোমবার সকাল-সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার পালাখাল, সাচার, রহিমানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ওই তিন দিন গড়ে ৫-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়। এখানে বিদ্যুৎ যাওয়ার পরিমান কম হলেও দীর্ঘসময় লোডশেডিং থাকে। এতে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি হচ্ছে।
কচুয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার দীপক চন্দ্র বলেন, ‘কচুয়া উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’
চাঁদপুর (সদর) শহর
চাঁদপুর শহরে গত এক সপ্তাহে লোডশেডিং এর পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। তবে চাঁদপুর বিদ্যুতের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ থেকে জানা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৩ থেকে ৫ বার এবং সন্ধ্যা ও রাতে মিলিয়ে ২ থেকে ৩ বার বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
তবে বাস্তবে উল্টো চিত্রের কথা জানা যায় । শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে বেলা সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে চারবার। এভাবে পর্যায়ক্রমে দিনরাত মিলিয়ে লোডশেডিং হয়েছে ৭-৮ বার। তবে লোডশেডিং এর সময় দীর্ঘক্ষণ না হলেওও ঘন ঘন শহরে বিদ্যুৎ যাচ্ছে। বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতিতে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত।
চাঁদপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ যাওয়ার কোনো সময় নেই। যখন তখন বিদ্যুৎ চলে যায়। সারাদিন কাজ করে রাতে ঘুমানোর সময় শান্তি পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বাড়িতে থাকা বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। যাদের বাড়িতে আইপিএস নেই তাদের দুর্ভোগ কতটা বলে বুঝানো যাবে না।’
চাঁদপুর শহরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে এবং ঘন ঘন লোডশেডিং নেই বলে বিদ্যুতের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ (বিউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান ভূঞা জানান, আমাদের এরিয়ায় সর্বোচ্চ চাহিদা ৩১ মেগাওয়াট। এখানে সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং হয়। যে পরিমাণ লোডশেডিং হয় এটিকে আমরা স্বাভাবিক বলতে পারি।
শরীফুল ইসলাম/এফএ/এএসএম








