ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। জেলার সাতকানিয়া ও বাঁশখালী দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি আছেন। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় অনেক এলাকায় পানি কমার বদলে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকায় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে।

সাঙ্গু ও ডলু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বসতঘর, আবাদি জমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বহু এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কোথাও কোমর থেকে গলা সমান পানি। নৌকা ও স্পিডবোট এখন অনেক দুর্গম এলাকায় যাতায়াত ও উদ্ধারকাজের একমাত্র ভরসা। বন্যায় লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি এবং মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন পাঁচজন।

সাতকানিয়ার ১৭ ইউনিয়নই প্লাবিত

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়ায়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের সবকটিই বন্যাকবলিত। শুধু এ উপজেলাতেই চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান জানান, ইউনিয়নের অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি রয়েছে। প্রায় ১৫০০ পরিবার চরম সংকটে রয়েছে। ত্রাণের বরাদ্দ থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‍“চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক এলাকায় সড়ক ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।”

বাঁশখালীতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় টানা কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সেনাবাহিনীর উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান

বন্যাকবলিতদের উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে। ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় জেলা প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় কাজ করছেন। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীতে ১০ পদাতিক ডিভিশন এবং বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দুর্গম এলাকায় আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে স্পিডবোট ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বন্যাকবলিত এলাকায় তিনটি ক্যাম্পও স্থাপন করেছে সেনাবাহিনী।

এ ছাড়া পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সন্দ্বীপে সহায়তা করছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।

সাতকানিয়ায় ৮০০ পরিবারকে ত্রাণ

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ৮০০ পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। ত্রাণের প্যাকেটে মুড়ি, চিড়া, চিনি, বিস্কুট, বিশুদ্ধ পানি, মোমবাতি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও জরুরি ওষুধ দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক জানান, অনেক দুর্গম এলাকায় সাধারণ নৌকা পৌঁছাতে পারছে না। এসব এলাকায় সেনাবাহিনীর স্পিডবোটের মাধ্যমে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কোন এলাকায় কতটি স্পিডবোট প্রয়োজন এবং কোন এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।

৬৭০ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত

বন্যাকবলিত মানুষের জন্য জেলায় ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২৩ হাজার ৮৫০ জন অবস্থান করছেন। আশ্রিতদের জন্য শুকনো ও রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৯ হাজার ৮০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি ত্রাণ হিসেবে আরো ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা মজুত রয়েছে। সাতকানিয়ার জন্য ইতোমধ্যে ৯ লাখ টাকা ও ২৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিনেও মাঠে থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের।

ব্যাপক ক্ষতি সড়ক, সেতু ও কালভার্টে

বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত কয়েক দিনের তুলনায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও রাইমসের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়াগত পরিস্থিতির প্রভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিও রয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার ও জেলা প্রশাসন বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত আছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদেরও বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।