বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে স্বৈরাচারী সরকার পতনের দাবিতে যখন সারাদেশ উত্তাল, তখন রাজপথ পরিণত হয় সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তদানের মঞ্চে। সেই গণআন্দোলনে জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ৩১ জন ঢাকাসহ সারাদেশে আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রাণ হারান। গুলির শব্দ, টিয়ারশেলের ধোঁয়া আর আতঙ্ক উপেক্ষা করে তারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে। দুই বছর পরও তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি এবং স্বজন হারানোর বেদনা বহন করে চলেছে পরিবারগুলো।

জুলাই-আগস্টের সেই রক্তাক্ত দিনগুলো শুধু একটি গণআন্দোলনের ইতিহাস নয়; অসংখ্য পরিবারের বুকভাঙা কান্না, ত্যাগ ও আত্মদানের এক মর্মস্পর্শী অধ্যায়। কেউ চাঁদপুরের রাজপথে, কেউ রাজধানী ঢাকায়, আবার কেউ নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে শহীদ হন। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবির আন্দোলন।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতেই। সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী হারানোর শোক আজও প্রতিদিন তাড়া করে ফেরে তাদের। জুলাই-আগস্ট ফিরে এলেই স্মৃতিগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অশ্রু ঝরান স্বজনরা।

ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন চাঁদপুর সদর উপজেলার রঘুনাথপুর এলাকার সাজ্জাদ হোসেন। অন্যদিকে ফরিদগঞ্জে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন শাহাদাত হোসেন। তাদের বাবা-মা আজও সন্তানের শেষ স্মৃতি হিসেবে ছবিই আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন।

ছবি আঁকড়ে আজও কাঁদেন শহীদদের স্বজনরা

সাজ্জাদ হোসেনের বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, ১৯ জুলাই ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে আমার ছেলে শহীদ হয়। আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়। জুলাই মাস এলেই ছেলের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। আমার স্ত্রী শুধু কাঁদে। তার শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবে না। প্রশাসন আমাদের খোঁজখবর নেয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু সন্তানের শূন্যতা তো আর কোনো কিছুতেই পূরণ হওয়ার নয়।

শাহাদাত হোসেনের মা সিরতাজ বেগম বলেন, আমার একটাই সন্তান ছিল। আন্দোলনে আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমার বুক খালি করে দিয়েছে। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়।

জুলাই যোদ্ধা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারাদেশের মতো চাঁদপুরেও আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছি। এই আন্দোলনে চাঁদপুরের ৩১ জন প্রাণ দিয়েছেন। আমরা চাই, শহীদ পরিবারের পাশে সরকার সবসময় থাকুক এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখুক।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, চাঁদপুরের ৩১টি শহীদ পরিবারের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি। সরকারি বিভিন্ন জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠানেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর রাখছে।

এফএ/এএসএম