দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় মানুষ যাতে আস্থা রাখতে পারে, সেভাবে সেবা দিতে চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, রোগীদের প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমেই দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি রোগীদের প্রতি সহমর্মী আচরণ অত্যন্ত জরুরি।

শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢামেক অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন তিনি। পরে প্রধানমন্ত্রী উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনেন। আলোচনায় শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একটাই প্রত্যাশা উঠে আসে-ঐতিহ্যের এই গৌরব ধরে রেখে ঢামেককে যেন বিশ্বমানের একটি আধুনিক গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।

চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। এর ফলে প্রতিবছর কমবেশি পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের মানুষের এই চিকিৎসা আমরা কেন দেশে করাতে পারব না? আমরা কেন মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারব না? এটা আইন প্রয়োগ করে হবে না। শুধু চিকিৎসকরাই পারবেন তাদের মানবিক অ্যাপ্রোচ আর সঠিক চিকিৎসাদানের মাধ্যমে দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ ফিরিয়ে আনতে।

সরকার সারা দেশে এক লাখ হেলথকেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ হবেন নারী হেলথকেয়ারার। যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতের পর সরকার দেশের ইতিহাসে এবারই স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। এ বছর জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সরকার বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় কমিয়েছে। সরকার সবকটি উপজেলায় ৩১ থেকে ৫১ বেডের প্রতিটি হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০১ বেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায়ও বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর বিদ্যমান শূন্যপদ দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরাই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকরাই রোগেশোকে কাতর মানুষটির পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার একজন রোগীর কাছে ওষুধের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।

বক্তব্যের শুরুতে ঢাকা মেডিকেল কলেজকে জীবন্ত ইতিহাস ও কালের সাক্ষী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু চিকিৎসাক্ষেত্রেই নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় ২০২৪ সালের বীর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

নিজে গাড়ি চালিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন : এদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন। তারা ‘ডিএমসি ডে’ উদ্বোধন করে কাজী ফজলুল হক হোস্টেলে যান। সেখানেই একসময় থাকতেন জুবাইদা রহমান। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন সরকারপ্রধান ও তার সহধর্মিণী। স্মৃতিচারণা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে যখন জুবাইদা রহমানকে মেডিকেলে নিয়ে আসতাম, তখন তাকে সামনের সিটে আমার পাশে বসিয়ে নিয়ে আসতাম। আজও আসার সময় তাকে বলেছি সামনের সিটে বসতে। পাশে বসিয়েই আপনাদের কাছে নিয়ে এসেছি। তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে সেলফি তোলেন শিক্ষার্থীরা।

চিকিৎসা পেশার প্রকৃত ভিত্তিই হলো মানবিকতা-জুবাইদা রহমান : নিজের চিকিৎসক জীবনের স্মৃতিচারণা করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক না কেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময় মানুষই থাকে। চিকিৎসা পেশার প্রকৃত ভিত্তিই হলো মানবিকতা। অনেক সময় একজন রোগীর জন্য চিকিৎসকের একটু আশ্বস্ত করার বাক্যও ওষুধের মতো কাজ করে। আগামী ২০ বা ২৫ বছর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসাবে দেখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডা. জুবাইদা রহমান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ড্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।

চিকিৎসাধীন ডা. পাভেলকে দেখতে হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী : বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেলের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বিকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. পাভেলকে দেখতে যান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে ডা. পাভেলের চিকিৎসার সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় অধ্যাপক পাভেলের সঙ্গে কথা বলেন এবং তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি তার দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।