চীনে প্রায় ৯ বছর পড়াশোনা ও বসবাসের অভিজ্ঞতায় প্রতিবছর জুন মাস এলেই একটি দৃশ্য আমাকে বারবার মুগ্ধ করে। বিশাল এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো যেন হঠাৎই এক অন্য রকম উৎসবের রঙে ভরে ওঠে। চারদিকে একাডেমিক গাউন পরা শিক্ষার্থী, হাতে ফুল, মা–বাবার হাসিমুখ, বন্ধুদের সঙ্গে শেষবারের মতো ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো, আর স্মৃতি ধরে রাখতে সারা দিন ছবি তোলার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাই যেন এক আবেগঘন উৎসবে পরিণত হয়। মনে হয়, পুরো চীন যেন শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদ্যাপনে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
সম্প্রতি নর্থ চায়না ইলেকট্রিক পাওয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে আমার পিএইচডি সম্পন্ন হয়েছে। নিজের সমাবর্তনের অভিজ্ঞতা আরও গভীরভাবে বুঝিয়েছে, চীনে গ্র্যাজুয়েশন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একজন শিক্ষার্থীর বছরের পর বছর ধরে চলা পরিশ্রম, ধৈর্য আর স্বপ্নপূরণের এক গর্বিত স্বীকৃতি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষার দেশ। এখানে তিন হাজারের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তাই জুন মাস এলেই দেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে সমাবর্তনের আয়োজন শুরু হয়। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে পুরো মাসজুড়ে তৈরি হয় এক অনন্য শিক্ষা-উৎসবের পরিবেশ, যাকে সবাই ‘গ্র্যাজুয়েশন সিজন’ নামে চেনে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জুন মাসে শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বেইজিংসহ বিভিন্ন শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের আনন্দ-উৎসব চলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই সাংহাই, নানজিং, উহান, সিয়ান, হারবিন কিংবা গুয়াংজুর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনের ছবি ও ভিডিও চোখে পড়ে। তখন খুব সহজেই বোঝা যায়, এটি কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়; বরং পুরো চীনের উচ্চশিক্ষা সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের জীবন্ত ঐতিহ্য।

নর্থ চায়না ইলেকট্রিক পাওয়ার ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে জুন মাসে প্রতিদিনই শত শত শিক্ষার্থী একাডেমিক গাউন পরে বিভিন্ন জায়গায় ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকে। লাইব্রেরির সামনে, গবেষণাগারের পাশে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে, লেকের ধারে কিংবা সবুজ মাঠে—সব জায়গাই যেন তাদের স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের সঙ্গে শেষবারের মতো ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আর পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সমাবর্তন নয়, বরং জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
চীনে গ্র্যাজুয়েশনকে ঘিরে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, পরিবারও সমানভাবে অংশ নেয়। অনেক অভিভাবক শত শত কিলোমিটার দূর থেকে সন্তানের এই বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফুলের দোকান, ফটোগ্রাফি সার্ভিস, পরিবহনসহ স্থানীয় অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক গতি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন পুরো শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও প্রাণবন্ত করে তোলে।

চীনের এই সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা থিসিস, গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক কাজ শেষ করার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি গ্রহণ করেন। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরিবার—সবাই একসঙ্গে সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি উদ্যাপন করতে পারেন।
আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, এটি একটি খুবই মানবিক ও কার্যকর একাডেমিক সংস্কৃতি। অনেক দেশে দেখা যায়, সমাবর্তন অনুষ্ঠান পড়াশোনা শেষ হওয়ার এক বা দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময়ের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী চাকরিতে যোগ দেন, বিদেশে চলে যান বা অন্য শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে অনেকেই নিজের সমাবর্তনে উপস্থিত থাকতে পারেন না, আর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের আনন্দ অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জুন মাসে শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বেইজিংসহ বিভিন্ন শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের আনন্দ-উৎসব চলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই সাংহাই, নানজিং, উহান, সিয়ান, হারবিন কিংবা গুয়াংজুর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনের ছবি ও ভিডিও চোখে পড়ে। তখন খুব সহজেই বোঝা যায়, এটি কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়; বরং পুরো চীনের উচ্চশিক্ষা সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের জীবন্ত ঐতিহ্য।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই তারা চেষ্টা করে শিক্ষাজীবনের শেষের খুব কাছাকাছি সময়েই সমাবর্তনের আয়োজন করতে, যাতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এই বিশেষ মুহূর্তের অংশ হতে পারেন। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি শুধু একটি সনদ গ্রহণ নয়; বরং পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এক অমূল্য স্মৃতি।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদি শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়মিতভাবে সমাবর্তনের আয়োজন করা যায়, তাহলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার এই আনন্দঘন মুহূর্তে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাবেন। এতে সমাবর্তন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শিক্ষাজীবনের একটি সত্যিকারের উৎসবে পরিণত হবে।

চীনে প্রায় ৯ বছরের শিক্ষা ও জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি, একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি শুধু গবেষণা, প্রযুক্তি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; শিক্ষার্থীদের অর্জনকে কীভাবে সম্মান জানানো হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, চীনের গ্র্যাজুয়েশন সিজন শুধু একটি সমাবর্তন নয়, এটি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণ, পরিবারের গর্ব, শিক্ষকদের সাফল্য এবং একটি জাতির শিক্ষা-সংস্কৃতির সুন্দর প্রতিফলন।
*লেখক: জান্নাতুল আরিফ, গবেষক, নর্থ চায়না ইলেকট্রিক পাওয়ার ইউনিভার্সিটি (এনসিইপিইউ), বেইজিং, চীন








