মুসাব্বির মাকিন ছিল সূর্য সময় বিশ্বাসের সহপাঠী ও প্রিয় বন্ধু। ক্লাসে ওরা পাশাপাশি বসতো, একসঙ্গে খেলতে যেতো। টিফিনে আনা খাবার ভাগাভাগি করে খেতো। ফিরতেও একই বাসে চড়ে। পাঁচ বছরের সেই গভীর বন্ধুত্ব থেমে যায় গত বছরের ২৫ জুলাই। এদিন ওপারে পাড়ি জমায় মাকিন।

রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মুসাব্বির মাকিন। ২৫ জুলাই রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। প্রিয় বন্ধুকে হারায় সূর্য সময় বিশ্বাস।

আরও পড়ুন

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির বছরপূর্তিতে দোয়া-স্মরণসভা

রোববার (১৯ জুলাই) সূর্যের সঙ্গে মাইলস্টোনের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে কথা হয়। সূর্য বলে, ‘জানেন আংকেল, মাকিন মারা যাওয়ায় আমার খুব একা লাগে। স্কুলে আসতে মোটেও ইচ্ছে করে না। বাধ্য হয়ে আসি। খেলতে গেলে ওর কথা মনে পড়ে, ক্লাসে গেলেও ওকে খুঁজি। প্রথমদিকে অন্য বন্ধুদের মাকিন বলেও ডেকে ফেলতাম। কেমন যেন হারিয়ে গেছে ও।’

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা

সপ্তমেই থেমে গেছে মাকিন, সূর্য এখন অষ্টমে

সূর্য সময় বিশ্বাস এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এক বছর আগে সে এবং মাকিন সপ্তম শ্রেণিতে পড়তো। সূর্য বলে, ‘আমি ক্লাস এইটে, কিন্তু মাকিনের লাইফ ক্লাস সেভেনে থেমে গেছে। আমরা গল্প করতাম দুজনেই সায়েন্স নেবো। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো, অনেক কিছু বানাবো। কিন্তু তা হয়নি।’

আরও পড়ুন

স্মৃতির শোক ভুলে সবুজের ছায়ায় নতুন জীবনের পথে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা

বন্ধুর বয়স ও জন্মতারিখও মনে আছে সূর্যের। সে বলে, ‘আমার জন্মতারিখ ১৩ মার্চ, ওর ১৩ নভেম্বর। দুজনেরই ১৩! এটা নিয়ে গল্প করতাম, মজা করতাম। ওর এবার ১৪ বছর বয়স হতো। আমার নভেম্বরে ১৪ হবে। জন্মদিনে আম্মু পিঠা বানিয়ে দিতো। স্কুলে এনে মিসকে দিতাম, অন্যদেরও দিতাম। মাকিনকে একটু বেশি দিতাম। গত বছর মাকিন মারা যাওয়ার পর পিঠা দেয়নি আম্মু। এবারও হয়তো আনা হবে না। কিছু আনলেও আর মাকিনকে দেওয়া হবে না।’

‘চোখ বুজলে আর্তনাদ শুনি, ভুলতে পারি না’

ভয়াবহ সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে সূর্য জানায়, আমরা দুজনেই ক্লাস থেকে বের হয়েছিলাম। ও কি করছিল ঠিক মনে নেই, আমি পাশের আরেকটা রুমে ছিলাম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম আগুন আর শব্দ, চিৎকার। চারদিকে আগুন, ধোঁয়া। কিছুক্ষণ পরই খুব আর্তনাদ। লোহার গ্রিল ভেঙে আমাকে উদ্ধার করেছিল। আমার শরীরের কোথাও কিছু হয়নি। শুধু ভয় পেয়ে গেছিলাম।’

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পর বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ

দুর্ঘটনার পর মুসাব্বির মাকিনকে আর দেখেনি সূর্য। সে বলে, আমাকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিতে হয়নি। মাকিন পুড়ে গেছে এটা শুনি রাতে আম্মুর কাছ থেকে। এরপর খুব খারাপ লাগছিল। তারপরও আশায় ছিলাম ও বেঁচে থাকবে, চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হবে। আম্মু-আব্বুও বলছিল মাকিন বেঁচে যাবে। কিন্তু তিন-চারদিন পর খবর পেলাম মাকিন মারা গেছে। অনেক কেঁদেছিলাম। কিন্তু ওকে আর দেখা হয়নি।’

আরও পড়ুন

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: আরেক দফা বাড়লো তদন্ত কমিশনের মেয়াদ

ঘটনার এক বছর পরও সেই আর্তনাদ ভুলতে পারেনি সূর্য। তার ভাষ্য, ‘দোতলার একটি কক্ষে আমি ও আরও কয়েকজন সহপাঠী আটকে ছিলাম। লোহার গ্রিল ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ইশারায় আমাদের বেরিয়ে আসতে বলা হয়। আমরা নিরাপদে ভালোভাবেই বেরিয়ে আসি। কিন্তু পাশের ক্লাসে আটকা পড়াদের আর্তনাদ, চিৎকার এখনো কানে বাজে। চোখ বুজলেই বন্ধুর আর্তনাদ শুনি, ওটা কখনো ভুলতে পারবো না।’

এএএইচ/এমএএইচ/ এমএফএ