গত সোমরার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল জাপান। কার্লো আনচেলত্তির জাদুকরি কৌশলে ২–১ ব্যবধানে জিতেছে ব্রাজিল। ডাগআউটে তাঁর শান্ত উপস্থিতিই বলে দিচ্ছিল, পদের ওজন কতখানি। মাঠে ১১ জন ফুটবলার জানপ্রাণ দিয়ে দৌড়ালেও আসল কলকাঠি কিন্তু নাড়েন ডাগআউটের ওই মানুষটিই। স্যুট-টাই পরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আসলে কোনো সাধারণ ট্রেইনার নন। তিনি বিশ্ব ফুটবলের বড় ব্র্যান্ড ব্রাজিলের বর্তমান ‘চিফ এক্সিকিউটিভ’।

বিশ্ব ফুটবলে একজন শীর্ষ কোচের বাজারমূল্য আজ যেকোনো রকস্টারের চেয়ে কম নয়। শুধু আনচেলত্তিই নন, ম্যানচেস্টার সিটির পেপ গার্দিওলা (ছেড়ে দিয়েছেন), ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের কোচ টমাস টুখেল কিংবা ‘স্পেশাল ওয়ান’ জোসে মরিনিওদের চাহিদাও এখন বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী। তবে এই রাজকীয় দুনিয়ার গ্ল্যামার কতটা তীব্র, তা বোঝা যায় এই মাস্টারমাইন্ডদের বার্ষিক বেতনের খতিয়ান দেখলে। স্পোর্টস ইকোনমির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পেপ গার্দিওলা বা কার্লো আনচেলত্তির মতো বৈশ্বিক শীর্ষ সারির কোচদের বার্ষিক বেতন এখন ১৫ থেকে ২৫ মিলিয়ন ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা) পর্যন্ত হয়ে থাকে!

বিসিএসে কেন প্রফেশনাল বা টেকনিক্যাল ক্যাডারে আগ্রহ হারাচ্ছেন মেধাবীরা

গ্ল্যামার ও মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ—

শুধু প্রধান কোচই নন, তাঁর পুরো কোচিং প্যানেলের পেছনেও ক্লাব বা দেশগুলোকে প্রতিবছর গুনতে হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। তবে এই বিশাল অঙ্কের পেছনে থাকে নিখাদ পেশাদারত্ব ও বাণিজ্যের হিসাব। তারকা খেলোয়াড়দের বড় ইগো সামলানো, দলবদলের বাজারে সেরা কম্বিনেশন তৈরি করা এবং প্রতি সপ্তাহের ম্যাচে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করা—সব মিলিয়ে এটি যেমন দারুণ রোমাঞ্চকর, তেমনই তীব্র স্নায়ুক্ষয়ী এক চাকরি।

ডাগআউটের এই গ্ল্যামার আর চ্যালেঞ্জের ছোঁয়া এখন এসে লেগেছে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ফুটবলেও। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ফুটবলের বর্তমান অবস্থা হয়তো খুব একটা জ্বলজ্বলে নয়। ঘরোয়া লিগের আগের সেই জৌলুস এখন আর দেখা যায় না। মাঠের পারফরম্যান্স নিয়েও দেশের ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের মনে একটা বড় আক্ষেপ রয়ে গেছে। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠে এক বিশাল সম্ভাবনাও কিন্তু উঁকি দিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ এবং বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি ফুটবলের হাত ধরে এ দেশে ফুটবলকে আধুনিক করপোরেট কাঠামোয় আনার একটা চেষ্টা চলছে।

ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চাকরি, পদ ৪৪, বয়স ৩৫ হলেও আবেদন

সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের হাতছানি—

দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ফুটবলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমাদের এখানে পেশাদারত্বের কাঠামোটি এখনো বেশ নড়বড়ে, অনেক কিছুই হয়তো পুরোপুরি শুরু হয়নি। তবে সঠিক পরিকল্পনায় এই খাতেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। আর খেলাটিকে বদলে দিতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আধুনিক চিন্তার দক্ষ স্ট্র্যাটেজিস্ট।

পেশা হিসেবে শুধু প্রধান কোচ হওয়াই কিন্তু শেষ কথা নয়। আধুনিক ফুটবলের হাত ধরে এই ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কিছু উপ খাত তৈরি হচ্ছে। যেমন দল ও প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চুলচেরা বিশ্লেষণ করার জন্য বাড়ছে ভিডিও ও ডেটা অ্যানালিস্টদের কদর। খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও খাদ্যাভ্যাসের বৈজ্ঞানিক তদারকির জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে স্পোর্টস সায়েন্স, ফিটনেস ও নিউট্রিশন এক্সপার্টদের। এ ছাড়া নির্দিষ্ট স্কিল উন্নয়নের জন্য গোলকিপিং বা ট্যাকটিক্যাল কোচের মতো আলাদা পদের চাহিদাও বাড়ছে, যেখানে বেতনকাঠামো বেশ আকর্ষণীয়।

ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের কোচ টমাস টুখেল

ফুটবল কোচিংয়ে আসতে হলে শুধু মাঠের পুরোনো অভিজ্ঞতাই সব নয়। এর জন্য এখন প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) নিয়মিত বিভিন্ন মেয়াদের লাইসেন্সিং কোর্স পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করতে সি, বি, এ এবং প্রো-লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের ওপর উচ্চতর প্রফেশনাল ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে, যা এই সেক্টরে করপোরেট এন্ট্রি নেওয়ার আধুনিক মাধ্যম।

ফুটবল কোচিং আজ আর স্রেফ হুইসেল বাজানোর চাকরি নয়। মাঠের নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি আর ফিন্যান্সিয়াল লিডারশিপের মেলবন্ধনে এটি এখন এক গ্ল্যামারাস ক্যারিয়ার।

চীনে বিনা মূল্যে স্নাতকোত্তর, শোয়ার্জম্যান স্কলারস প্রোগ্রামের সব তথ্য জেনে নিন