কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরে বর্ষা মৌসুমে নৌপথই এখন জীবন-জীবিকার একমাত্র ভরসা। আর সেই নির্ভরশীলতাকেই পুঁজি করে সংঘবদ্ধ নৌ-ডাকাত চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এতে অশান্ত হয়ে পড়েছে হাওরাঞ্চল। একের পর এক লুটপাটের ঘটনায় জেলে, ব্যবসায়ী, যাত্রী ও পর্যটকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ডাকাতের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশ যৌথভাবে বিশেষ নৌ-টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে ডাকাতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।
সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে বিশেষ অভিযান চলবে।
আরও পড়ুন
পর্যটক সংকটে ম্লান হাওরের পর্যটন
একের পর এক ডাকাতিতে আতঙ্ক
গত ৭ জুলাই রাতে মিঠামইন ও করিমগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ৪০ জন পর্যটককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতরা। তাদের মারধর করে মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নেওয়া হয়।
‘হাওরের একটি বড় নৌ-ডাকাতির রহস্য ইতোমধ্যে উদ্ঘাটন করা হয়েছে। জড়িত ডাকাতচক্রের সদস্যদের গ্রেফতার, লুণ্ঠিত মালামাল এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।’
এরপর ৭ জুলাই রাত ১০টার দিকে করিমগঞ্জের বালিখোলা ঘাট থেকে মিঠামইনের ঘাগড়াগামী একটি ট্রলারে ডাকাতি হয়। সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও সুইজগেট এলাকায় ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী ওই ট্রলারে হামলা চালিয়ে ডাকাতরা তিনটি মোবাইল ফোন, একটি সোলার ব্যাটারি এবং নগদ অর্থ লুট করে নেয়। মানবিক এই ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
সবশেষে ৮ জুলাই রাত সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেয়ারপুর ব্রিজসংলগ্ন বগাডুবি খাল এলাকায় যাত্রীবাহী ট্রলারে দেশীয় অস্ত্রের মুখে ডাকাতি হয়। এ সময় হাঁড়ি-পাতিল, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, দুটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৭৪ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা।
ডাকাত আতঙ্কে হাওরের নিরাপ্তায় কাজ করছে টুরিস্ট পুলিশ/ ছবি: জাগো নিউজ
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক ডাকাতির ঘটনায় সন্ধ্যার পর নৌ চলাচল কমে গেছে। জেলেরা রাতে মাছ ধরতে ভয় পাচ্ছেন, ব্যবসায়ীরা মালামাল পরিবহনে ঝুঁকি অনুভব করছেন এবং অনেক পর্যটক ভ্রমণ বাতিল করেছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে কড়া নজরদারি
পুলিশ সূত্র জানায়, অতীতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত নৌপথ ও নির্জন খালগুলোতে নিয়মিত নৌ-টহল দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হাসানপুর ব্রিজ, কলিরভিটা, কাটাখালি, শিমুলবাগ, ছিলনী ব্রিজ, বড়িবাড়ি, বাদলা সংলগ্ন হাওর এবং অষ্টগ্রাম থেকে বাজিতপুর ও নাসিরনগরগামী নৌরুটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সন্দেহভাজন ট্রলার ও নৌযান থামিয়ে তল্লাশি, মাঝিদের পরিচয় যাচাই, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও মাঝিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাকাতচক্রের সদস্যদের তালিকা হালনাগাদ ও আন্তঃজেলা অপরাধচক্র শনাক্তেও কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের টহলে ফিরবে আস্থা
পুলিশের এই বিশেষ অভিযানের পর হাওরের মাঝি, জেলে ও ব্যবসায়ীদের মনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
ইটনার মাঝি হুমায়ুন মিয়া বলেন, আগে সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কে বুক কাঁপতো। যাত্রীরা রাতে নৌকায় উঠতো না। এখন পুলিশের নিয়মিত টহল দেখে আমরা সাহস পাচ্ছি।
‘আগে রাতে চলাচলে কোনো ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার আগেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কিনা, সেই দুশ্চিন্তা কাজ করে। ইউনিয়ন পরিষদের মতো ব্যস্ত জায়গায় দিনের আলোতে ডাকাতির ঘটনা ঘটবে, তা আগে কল্পনাও করা যেত না।’
মাছ ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম বলেন, রাতে লাখ লাখ টাকার মাছ নিয়ে বাজারে যেতে হয়। ডাকাতির ভয়ে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পুলিশের টহল চলায় এখন নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারব।
পর্যটক রাকিব হাসান জানান, ডাকাতির খবর শুনে বন্ধুরা ভ্রমণ বাতিল করেছিল। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে হাওরে আবার পর্যটকদের ঢল নামবে।
ইটনা ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী জাগো নিউজকে বলেন, মাঝিদের মধ্যে ডাকাত আতঙ্ক তো আছেই। তবে কয়েকদিন ধরে চামড়া বন্দর থেকে বিকেল ৫টায় ছেড়ে আসা ইটনাগামী সর্বশেষ ট্রলারটি পুলিশি নিরাপত্তায় রাত ৮টার দিকে ইটনায় পৌঁছাচ্ছে। এতে মাঝিদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরে এসেছে।
ইটনা হাওরের ট্রলারে মালামাল তুলছেন শ্রমিকরা/ ছবি: জাগো নিউজ
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক ডাকাতির ঘটনার পর হাওরে পুলিশের টহলও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নৌকার মাঝিদের মধ্যে আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে নিরাপত্তার কারণে রাতে যাত্রীবাহী নৌকা ও ট্রলার চলাচল এখনও বন্ধ রয়েছে।
হাওরের মাছ ব্যবসায়ী গোপেশ বর্মণ বলেন, প্রতিদিন হাওর থেকে মাছ ধরে জেলেরা ইটনা বাজারে এনে বিক্রি করেন। কিন্তু ডাকাত আতঙ্কের কারণে এখন তারা আগের মতো গভীর রাত পর্যন্ত মাছ ধরতে সাহস পান না। বর্তমানে সর্বোচ্চ রাত ২টা পর্যন্ত মাছ ধরে ফিরে আসেন। অথচ ডাকাতের ভয় না থাকলে ভোর পর্যন্ত মাছ ধরতেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মাছ আহরণের পরিমাণও কমে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। এই আতঙ্ক দূর হলে মাছ আহরণ আবারও বেড়ে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক বাচ্চু জাগো নিউজকে বলেন, আগে রাতে চলাচলে কোনো ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার আগেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কিনা, সেই দুশ্চিন্তা কাজ করে। ইউনিয়ন পরিষদের মতো ব্যস্ত জায়গায় দিনের আলোতে ডাকাতির ঘটনা ঘটবে, তা আগে কল্পনাও করা যেত না।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন গ্রামের কিছু মানুষ ডাকাতদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কয়েকদিন ধরে হাওরে রাতে পুলিশের টহল বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
আরও পড়ুন
লাগামহীন ভাড়া-অব্যবস্থাপনায় পর্যটকশূন্য নিকলী হাওর
নিরাপত্তায় নতুন কৌশল
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ বলেন, প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত হাওরে টহল চলছে। হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা গেলে ডাকাতি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ইটনা থানার ওসি হাবিবুল্লাহ খান বলেন, প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল দেওয়া হচ্ছে। পানি কমে গেলে সড়কপথেও অভিযান বাড়ানো হবে।
‘মাঝিদের মধ্যে ডাকাত আতঙ্ক তো আছেই। তবে কয়েকদিন ধরে চামড়া বন্দর থেকে বিকেল ৫টায় ছেড়ে আসা ইটনাগামী সর্বশেষ ট্রলারটি পুলিশি নিরাপত্তায় রাত ৮টার দিকে ইটনায় পৌঁছাচ্ছে। এতে মাঝিদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরে এসেছে।’
অষ্টগ্রাম থানার ওসি মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান বলেন, থানা পুলিশ, নৌ পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে টহল ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া হাওরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নৌ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি কে এম আরিফুল বলেন, হাওর অঞ্চল সরাসরি নৌ পুলিশের আওতাভুক্ত না হলেও জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ রিজিয়ন টুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার মো. নাইমুল হক বলেন, বিকেল ৫টার পর যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। তবে জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী কিংবা মরদেহ পরিবহনের ক্ষেত্রে পুলিশি নিরাপত্তায় পারাপারের ব্যবস্থা করা হবে।
বড় ডাকাতির রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, হাওরের একটি বড় নৌ-ডাকাতির রহস্য ইতোমধ্যে উদ্ঘাটন করা হয়েছে। জড়িত ডাকাতচক্রের সদস্যদের গ্রেফতার, লুণ্ঠিত মালামাল এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
তিনি জানান, দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকেল সাড়ে ৫টার পর হাওরে অবস্থান না করার আহ্বান জানান।
ডাকাতদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী-এমপির কঠোর বার্তা
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে হাওরবাসীকেও ডাকাত প্রতিরোধে সংগঠিত হতে হবে। তিনি সন্ধ্যার পর হাওরে নৌযান চলাচল সীমিত রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ডাকাতদের তালিকা রয়েছে। এটি আমার শেষ সতর্কবার্তা। অপরাধ ছেড়ে না দিলে হাওরে তাদের কোনো জায়গা হবে না, জায়গা হবে জেলখানায়।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওর/ ছবি: জাগো নিউজ
তিনি ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন থানার জন্য তিনটি দ্রুতগতির স্পিডবোট বরাদ্দের দাবি জানিয়ে বলেন, নিশ্চিন্তে হাওরে আসুন। আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, হাওরাঞ্চলে ডাকাতি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
মাছির ‘পেটে’ ১০০ কোটি টাকার ফজলি আম
তিনি বলেন, ডাকাতদের তালিকা প্রশাসনের কাছে রয়েছে। পূর্ববর্তী রেকর্ডের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান চালালে তারা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।
হাওরবাসীর প্রত্যাশা, চলমান বিশেষ নৌ-টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও সমন্বিত অভিযান পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে অব্যাহত থাকলে নৌপথে মানুষের আস্থা ফিরবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও পর্যটনও স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে।
এনএইচআর/এএসএম








