দেশে এখন প্রায় তিন ডজন প্রজাতির বিদেশি ফল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ডজনখানেক ফল চাষাবাদে এসেছে বাণিজ্যিক সফলতা। সবচেয়ে এগিয়ে আছে মাল্টা ও ড্রাগন। এরই মধ্যে ড্রাগন ফল ইউরোপের দেশ সুইডেনে রপ্তানিও হয়েছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৪ প্রজাতির বিদেশি ফল বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ হয়। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বা ছাদবাগানে শৌখিনভাবে চাষ হওয়া ফলের সংখ্যা হিসাব করলে এটি আরও বেশি।
এর মধ্যে নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে চাষ হওয়া প্রধান বিদেশি ফলগুলো হলো- ড্রাগন, মাল্টা, নাশপাতি, কমলা, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, স্ট্রবেরি, সৌদি খেজুর, কিউই, লংগান, ল্যাংসাট, জাবাটিকাবা, শান্তল, পিচফল, আলুবোখারা, পার্সিমন, এগফ্রুট, সাওয়ার সপ, প্যাসন ফ্রুট ও ডুরিয়ান।
বিদেশি ফল আনারকলি
তথ্য বলছে, এসব ফলের মধ্যে ডজনখানেক বিদেশি ফলকে এরই মধ্যে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটির জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এগুলোর মাধ্যমে দেশের বাজারে আমদানি করা ফলের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
ড্রাগন-মাল্টার ‘নীরব বিপ্লব’
বছর পাঁচেক আগেও ড্রাগনকে মনে করা হতো ‘উচ্চবিত্তের ফল’। সে সময় ফলটি ছিল অভিজাত সুপারশপের কাচঘেরা তাকে। কিন্তু এখন সে ফল ভ্রাম্যমাণ ভ্যানেও মিলছে। দাম কমে উচ্চবিত্তের এ ফল এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
বিদেশি ফলের একটি বাড়তি চাহিদা আগে থেকেই ছিল। যে কারণে এসব ফলের বাণিজ্যিক মূল্য বেশি, চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। কিছু ফল বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির জন্য উপযোগীও। সেসব ফলে সফলতা আসছে।-কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মইনুল হক
শুধু ড্রাগন নয়, মাল্টা, থাই পেয়ারা, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, সৌদি খেজুর কিংবা পার্সিমনের মতো অর্ধশতাধিক বিদেশি ফল এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে।
আরও পড়ুন
ঝিনাইদহে বিদেশি ফল চাষে সম্ভাবনা, আগ্রহী কৃষকেরা
দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই ফলগুলো এখন যাচ্ছে ইউরোপের বাজারেও। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে দেশের ফল উৎপাদনে একটি ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটে গেছে।
কয়েকদিন আগে জাতীয় ফল মেলা উদ্বোধনের সময় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ তৃপ্তি নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কয়েক বছর আগে ড্রাগন ফল আমদানি করতে হতো। এখন আমরা স্বপ্ন দেখছি ড্রাগন ফল রপ্তানির। আমাদের দেশের আবহাওয়ার কারণে আমরা এ সাহস পাচ্ছি। কারণ, বাইরের দেশের ড্রাগন এত সুস্বাদু হয় না।’
দেশের মাটিতে বিদেশি ফল
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে দ্রুত ড্রাগনের উৎপাদন বাড়ছে। বাংলাদেশে এ ফলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই সময় থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে বিভিন্ন জাতের ড্রাগন ফল দেশে আনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় চাষাবাদ।
তবে এ ফলের বাণিজ্যিক প্রসার হয় ২০২০ সালের পরে। যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৮৭২ টন ড্রাগন। সেখানে পরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের উৎপাদন দাঁড়ায় ৫১ হাজার ২৮৭ টন। ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ৮১৩ মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ উৎপাদন এক লাখ টনের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, গত বছর প্রথমবারের মতো ইউরোপের দেশ সুইডেনে ড্রাগন ফল রপ্তানি করা হয়েছে।
এ খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো- আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা এখন ফলের বাণিজ্যিক চাষে ক্যারিয়ার গড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে চাকরির পেছনে না ছুটে এসব ফল চাষাবাদে অনেকে সফল হয়েছেন। বাণিজ্যিক ফল চাষে যে বিপুল আয় সম্ভব, তা সাধারণ কৃষিতে ভাবা যায় না।-কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান
ড্রাগনের মতো উৎপাদন বাড়ছে মাল্টারও। পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে কৃষক ও উদ্যোক্তারা এখন মাল্টা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় পাহাড়ের মতো সমতলের নতুন প্রজন্মের কৃষকদের কাছেও এই ফল চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন
আনারকলি ফল চাষে সফল ঝিনাইদহের স্টালিন
তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মাল্টার উৎপাদন ছিল ১৭ হাজার টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৮৪ হাজার টন ছাড়িয়েছে। একই সময়ে মাল্টার বাগানের পরিমাণ ২ হাজার ৪৩৩ হেক্টর থেকে বেড়ে প্রায় আট হাজার হেক্টরে উঠেছে।
এছাড়া শীতপ্রধান দেশের আকর্ষণীয় ফল স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ বাংলাদেশে শুরু হয় ২০০৭ সালে। নানান ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দেশে স্ট্রবেরি উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
বিদেশি ফল আঙুর ও মাল্টা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মইনুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিদেশি ফলের একটি বাড়তি চাহিদা আগে থেকেই ছিল। যে কারণে এসব ফলের বাণিজ্যিক মূল্য বেশি, চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। কিছু ফল বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির জন্য উপযোগীও। সেসব ফলে সফলতা আসছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব বিদেশি ফল চাষের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম এলাকাও এখন বাণিজ্যিক ফল চাষের আওতায় এসেছে।’
ডলারের বাড়তি রেট ও শুল্কায়নের কারণে আমদানি করা আপেল বা আঙুরের খরচ অনেক বেড়েছে। তবে দেশে বিদেশি ফলের প্রচুর উৎপাদন থাকায় ক্রেতারা এসব ফলের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।-বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম
ড্রাগন, মাল্টা, স্ট্রবেরি ছাড়াও দেশে অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, বারোমাসি আঠাবিহীন কাঁঠালসহ প্রায় ১২টি বিদেশি ফল মাঠপর্যায়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। স্বাদ ও ফলন ভালো হওয়ায় এগুলো আমদানি করা ফলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশের বাজারের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে।
আরও পড়ুন
বিদেশি আঙুরসহ মিশ্র ফল বাগানে স্বপ্ন দেখছেন জিল্লু
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘এ খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো- আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা এখন ফলের বাণিজ্যিক চাষে ক্যারিয়ার গড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে চাকরির পেছনে না ছুটে এসব ফল চাষাবাদে অনেকে সফল হয়েছেন। বাণিজ্যিক ফল চাষে যে বিপুল আয় সম্ভব, তা সাধারণ কৃষিতে ভাবা যায় না। এটি অনেক বিদেশি ফলে হয়েছে।’
কমছে আমদানিনির্ভরতা
দেশি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিদেশি ফলের সরবরাহ বাড়ায় বাজারে ফলের দাম যেমন স্থিতিশীল থাকছে, তেমনি কমেছে আমদানিনির্ভরতা।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডলারের বাড়তি রেট ও শুল্কায়নের কারণে আমদানি করা আপেল বা আঙুরের খরচ অনেক বেড়েছে। তবে দেশে বিদেশি ফলের প্রচুর উৎপাদন থাকায় ক্রেতারা এসব ফলের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।’
এনএইচ/এএসএ/ এমএফএ








