রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা জেলা আম উৎপাদনের জন্য দেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এসব জেলার আম যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি এলাকায় আমের ফলন বাড়লেও তৈরি হচ্ছে না রপ্তানির সুযোগ।

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আম ছাড়াও কাঁঠাল, আনারস, ড্রাগন ফলের বাম্পার ফলন হলেও রপ্তানির সুযোগ এখনো সীমিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট না থাকা, প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে আমাদের দেশে উড়োজাহাজ ভাড়া বেশি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত বাগানে কোয়ারেনটাইন নিশ্চিত করতে না পারার কারণে চট্টগ্রাম থেকে ফল রপ্তানি বাড়ানো যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন

পাহাড়ে অ্যাভোকাডো চাষে সফল ওমর শরীফ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাজা ফল রপ্তানি করে চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকার ইবকো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ অভি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা আম, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল রপ্তানি করি। ইউরোপের বাজারে আমাদের ফল রপ্তানি হয়। সমুদ্রপথে রপ্তানিতে রেফার কনটেইনারে ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) যা খরচ হয়, উড়োজাহাজের ফ্রেইট এর চেয়ে অনেক বেশি হয়।’

পাহাড়ে ফল চাষ

চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় ফলের ফলন বেশি হলেও ইউরোপের বাজারে এখানকার ফল রপ্তানির সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ইউকেতে যে আম পাঠাই সেগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী এলাকা থেকে সংগ্রহ করি। কারণ ওখানকার বাগানগুলো সরকারিভাবে তদারকি করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘বাগানগুলোতে কোয়ারেনটাইন মানা হয়। কিন্তু আমাদের পার্বত্য এলাকাগুলোতে সরকারিভাবে কোয়ারেনটাইন ব্যবস্থাপনা নেই। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাইন্ডিংসের কারণে ইউরোপের বাজারে এখানকার তাজা ফল রপ্তানির সুযোগ নেই।’

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখনো কার্গো ফ্লাইট অপারেট হয় না। এখানে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু ফ্লাইট রয়েছে, যা দিয়ে সবজির সঙ্গে কিছু তাজা ফল রপ্তানি হয়। কিন্তু ইউরোপে কোনো ফ্লাইট নেই। যারা তাজা ফল রপ্তানি করতে চান, তাদের ঢাকা হয়ে রপ্তানি করতে হয়।-চিটাগাং ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহবুব রানা

চিটাগাং ফ্রেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহবুব রানা। তিনি নিজেও তাজা ফল রপ্তানির সঙ্গে জড়িত।

কথা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলায় গত কয়েকবছর ধরে প্রচুর আম, আনারস, কাঁঠাল উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সুযোগের অভাবে এসব ফল রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাজা ফল রপ্তানিতে অনেক বাধা। এসব বাধা পেরিয়ে খুব কম সংখ্যক ফল রপ্তানি হচ্ছে।’

পাহাড়ে ফল চাষ

তাজা ফল রপ্তানিতে অত্যধিক বিমান ভাড়া প্রধান অন্তরায় দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে কানাডায় এক কেজি আম পাঠাতে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা উড়োজাহাজ ভাড়ায় খরচ হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ থেকে কানাডায় এক কেজি আম রপ্তানি করতে শুধু উড়োজাহাজ ভাড়া লাগে ৭০০ টাকা। এ কারণে রপ্তানি বাড়ছে না। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে, সেখানে আমরা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি।’

অভিযানের নামে ‘খাদ্যে প্রতারণা’ শব্দটি ব্যবহার করে পুরো সেক্টরকে অপরাধী হিসেবে চিত্রায়ন করা হচ্ছে জানিয়ে বলেন, ‘এ সমালোচনা এড়িয়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।-বাপার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ শোয়াইব হাসান

চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরকে নামেই আন্তর্জাতিক অভিযোগ করে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখনো কার্গো ফ্লাইট অপারেট হয় না। এখানে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু ফ্লাইট রয়েছে, যা দিয়ে সবজির সঙ্গে কিছু তাজা ফল রপ্তানি হয়। কিন্তু ইউরোপে কোনো ফ্লাইট নেই। যারা তাজা ফল রপ্তানি করতে চান, তাদের ঢাকা হয়ে রপ্তানি করতে হয়।’

আরও পড়ুন

মিরসরাইয়ের পাহাড়ে চাষ হচ্ছে থাই সফেদা

কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসর অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ শোয়াইব হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অ্যাগ্রো প্রসেসড ফুড রপ্তানিতে এখনো শত বাধা রয়েছে। নেতিবাচক সমালোচনা এ শিল্পের প্রধান অন্তরায়।’

`অভিযানের নামে ‘খাদ্যে প্রতারণা’ শব্দটি ব্যবহার করে পুরো সেক্টরকে অপরাধী হিসেবে চিত্রায়ন করা হচ্ছে জানিয়ে বলেন, ‘এ সমালোচনা এড়িয়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।’

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পে অভিজ্ঞদের নিয়ে নীতিমালা তৈরি করতে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ে বসে নীতিমালা করা হয়। যে নীতিমালা কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বড় সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে অন্যতম সহযোগী হিসেবে সামনে আসতে হবে। তাহলে প্রক্রিয়াজাত ফল ও খাদ্য রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের পথ আরও অবারিত হবে।’

পাহাড়ে ফল

চট্টগ্রাম বন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল রপ্তানি হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র (প্ল্যান্ট কোয়ারেনটাইন স্টেশন) সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে ২৩৫ টন ৪১২ কেজি তাজা ফল রপ্তানি হয়েছে। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০৫ টন ৭২৯ কেজি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১৬ টন ৪শ কেজি তাজা ফল রপ্তানি হয়েছিল।

একইভাবে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী উড়োজাহাজের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৮ টন ৮৮১ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২৩ টন ৫৬০ কেজি এবং ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ২৮৮ টন ৬১৮ কেজি তাজা ফল রপ্তানি হয়েছে।

এসব ফলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, আনারস, লেবু, জাম, পেঁয়ারা, বরই, নারিকেল, আমড়া, জলপাই, সাতকড়া, বেল, তেঁতুল, কাঁচাতাল, লিচু, চালতা ও জাম্বুরা। এর মধ্যে লেবু, আম, কাঁঠাল, আমড়া, জলপাই বেশি রপ্তানি হয়।

আরও পড়ুন

পাহাড়ে লটকন চাষে সফলতার স্বপ্ন কৃষকদের

এসব তাজা ফল রপ্তানি হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, সুইডেনে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হয় বেশি।

দেশের মোট আয়তনের এক দশমাংশের বেশি সীমানা তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় তিনটি পার্বত্য জেলায়। আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেঁপে, কমলাসহ ৪৪ জাতের ফল উৎপাদিত হচ্ছে এ তিন জেলায়। প্রায় ১৫ লাখ টনের কমবেশি ফল উৎপাদিত হয় রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে।

তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী জেলার কৃষি কার্যক্রম তদারক করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

কাজু

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের তিন পার্বত্য জেলায় প্রচুর মৌসুমি ফল উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বছর আমের ফলন বাড়ছে। এসব ফল সুস্বাধু ও সুমিষ্ট। তবে যোগাযোগ অবকাঠামো অনুন্নত থাকার কারণে ফলের বাগানগুলোকে কোয়ারেনটাইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।’

ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে তাজা ফল রপ্তানি করতে হলে উৎপাদনের শুরু থেকে কোয়ারেনটাইন মেনটেন করতে হয় জানিয়ে বলেন, ‘পার্বত্য জেলাগুলোতে এখনো সে সুবিধা গড়ে ওঠেনি। তবে সরকারের এ বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। বান্দরবানে কোয়ারেনটাইন নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আমাদের একটি প্রকল্প চলমান। খাগড়াছড়িতে একটি বাগান থেকে আম রপ্তানির প্রত্যয়ন করা হয়েছে। তবে বড় আকারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন

গারো পাহাড়ে আনারস চাষে নতুন সম্ভাবনা

পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে ফলের বাগানগুলোকে কোয়ারেনটাইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন পার্বত্য জেলাগুলোতে মৌসুমে ফলের প্রচুর ফলন হলেও উৎপাদনকারীরা ভালো দাম পান না। পাহাড়ে ২০, ২৫, ৩০ টাকা কেজিতে ভালো আম বিক্রি হচ্ছে। যেগুলো চট্টগ্রামে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়।’

‘রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি হলে উৎপাদনকারী কিংবা বাগান উদ্যোক্তারা ভালো দাম পাবেন। এতে তারা উপকৃত হবেন। নতুন নতুন বাগানও তৈরি হবে। একসময় দেখা যাবে চট্টগ্রামের তিন পাহাড়ি এলাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুনাম পাবে,’ বলছিলেন সরকারের এই কৃষি কর্মকর্তা।

কোয়ারেনটাইন কী?

কোয়ারেনটাইন (Quarantine) বা সঙ্গনিরোধ হলো- কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন কোনো সুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্যদের থেকে আলাদা রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ওই ব্যক্তি সত্যিই সংক্রমিত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা এবং রোগের বিস্তার রোধ করা।

একইভাবে ফলের বাগানে কোয়ারেনটাইন বলতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাকে বোঝায়। এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ফলের বাগানে বাইরে থেকে নতুন রোগবালাই বা ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ ঠেকানো হয়। একই সঙ্গে, বাগানে কোনো রোগ দেখা দিলে, তা যেন আশপাশের অন্য কোনো সুস্থ বাগানে বা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এমডিআইএইচ/এএসএ