বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম ও জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ধর্ষণের কারণ, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ নিয়ে নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।

তাদের মতে, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি, মাদক ও পর্নোগ্রাফির প্রভাবসহ একাধিক কারণ কাজ করছে। একই সঙ্গে তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

এ বিষয়ে পাবিপ্রবির ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন রাইজিংবিডির পাবিপ্রবি সংবাদদাতা আহসান হাবীব আতিক।

পাবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি শেখ মুজাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতাকে দেখা যায়। অনেক অপরাধী দ্রুত শাস্তি না পাওয়ায় অপরাধ করার সাহস পায়। পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবণতা এবং সামাজিক লজ্জার কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না। এছাড়া, মাদকাশক্তি, অনলাইন নেতিবাচক কনটেন্ট এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে অনলাইনে সহজলভ্য যৌন কনটেন্ট বা ভিডিও অনেক সময় মানুষের বিকৃত আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দেয়, যা সহিংস মানসিকতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান সময়ের সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে আগের তুলনায় এসব ঘটনা এখন বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা। ফলে আগে যেসব ঘটনা আড়ালে থেকে যেত, সেগুলো এখন দ্রুত সামনে আসে। একই সঙ্গে নগরায়ন, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতা পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করেছে। ফলে একদিকে ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে দৃশ্যমানতাও বেড়েছে।

পাবিপ্রবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি তুষার মাহমুদের মতে, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হতে হবে নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক। আইনের কঠোরতা নয়, বরং তার সঠিক প্রয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যখন আইন থাকে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগে দুর্বলতা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে তখন অপরাধীরা সাহস পায়। নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি এবং বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যখন অপরাধীরা দেখে যে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করেও তারা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে, তখন সমাজে ভয় কমে যায় এবং অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। বিচারহীনতা একটি অপরাধকে উৎসাহ দেয়, প্রতিরোধ করে না।

তিনি আরো বলেন, “দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার অপরাধ দমনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিচার যত বিলম্বিত হয়, ততই তা ভুক্তভোগীর জন্য কষ্টদায়ক এবং অপরাধীর জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়ায়। ‘Justice delayed is justice denied’—এটা শুধু একটি কথা নয়, বাস্তব সত্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হতে হবে নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক। তাদের কাজ হবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করা নয়। জনগণের আস্থা অর্জন করাই তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা, হয়রানির আশঙ্কা এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের প্রভাবশালী অবস্থান এসব কারণে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পান। অনেক সময় তারা ন্যায়বিচারের চেয়ে অপমানকে বেশি ভয় পান। সমাজকে নৈতিকতা ও ইসলামী মূল্যবোধে ফিরে আসতে হবে। বিচার ব্যবস্থাকে হতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। অপরাধীদের প্রতি কোনো প্রকার ছাড় নয় এই নীতিতে অটল থাকতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”

পাবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দরিকুল ইসলাম মনে করেন, সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনই হতে পারে ধর্ষণ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। তার ভাষ্য, “নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এখনো এ ধরনের অপরাধের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। শুধু আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়; আইনের পাশাপাশি কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক প্রতিরোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন জরুরি।আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো ভুক্তভোগীকেই অনেক সময় দায়ী করা হয়। ধর্ষণের শিকার নারীকে অনেক ক্ষেত্রে ছোট করে দেখা হয় বা তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পোশাক বা ব্যক্তিগত আচরণকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগীকে দায়ী করার প্রবণতা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত, যা পরিবর্তন করা জরুরি।নৈতিকতার অবক্ষয়ও ধর্ষণের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেমন মসজিদভিত্তিক উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।”

পাবিপ্রবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক আবু সামা মনে করেন, বিচারে দীর্ঘসুত্রিতা ন্যায়বিচারকে ভূলন্ঠিত করে। তার মতে, “ধর্ষণ বর্তমান সমাজের মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সমাজে মাদক,পর্ণগ্রাফি সহজলভ্য হওয়ার ফলে মানুষ বিকৃত যৌনাচার এবং ধর্ষণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আমি মনে করি, ধর্ষনের প্রসারতার সবচেয়ে বড় কারণ বিচারহীনতা অথবা বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা। একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ বলেছিলেন, বিচারে দীর্ঘসুত্রিতা ন্যায়বিচারকে ভূলন্ঠিত করে। এক্ষেত্রে ধর্ষণ কমাতে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে, ধর্ষকের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা।”

তিনি আরো বলেন, “আইন দিয়ে সবসময় অপরাধ প্রত্যাশার আলোকে কমানো যায় না। এক্ষেত্রে আইন এবং সামাজিক পরিবর্তন উভয়ই জরুরি। অপরাধ কমানোর প্রথম স্টেপ সামাজিক পরিবর্তন এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ হচ্ছে আইন প্রয়োগ। তাই আইন প্রয়োগের ধর্ষণরোধ অথবা কমাতে সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা,সামাজিকভাবে অপরাধ প্রতিরোধের চর্চা সবচেয়ে জরুরি। সমাজে ‘victim blaming’ চর্চা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভুমিকা রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণামূলক শিক্ষা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হবে এবং ধর্ষণের মতো ঘৃন্য অপরাধ কমে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‎যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল কার্যকর করা,কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা,ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ,ছাত্র-ছাত্রী উভয়ের জন্য সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা যেতে পারে। গণমাধ্যম চাইলে সমাজে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে।ইতিবাচক ভূমিকা হতে পারে:ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা,দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন,নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন না করা এবং সুস্থ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সম্মানের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।”

পাবিপ্রবির ইনকিলাব মঞ্চের ভারপ্রাপ্ত আহ্ববায়ক মজনু আলম ধর্ষণকে সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটেরও প্রতিফলন। পর্নোগ্রাফির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, নারীর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার ঘাটতি এবং সহিংস পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে। তবে কোনো একক কারণকে দায়ী করলে বাস্তবতা আড়াল হয়। রাষ্ট্রেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বিচারহীনতা, দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত এবং প্রভাবশালীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি, সবকিছুতেই রাজনীতিক পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ অপরাধীদের আরো সাহসী করে তোলে। একইসঙ্গে, ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে দুর্বল করে এবং নারীদের আরও অনিরাপদ করে তোলে। সামাজিক নীরবতাও বড় সমস্যা—অন্যায় দেখে চুপ থাকা অপরাধকে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দেয়।”

ইনকিলাব মঞ্চের প্রচার সম্পাদক মনে করেন, ধর্ষণ রোধে শুধু আইন নয়, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা কোনো একক কারণে ঘটছে না, বরং এটি সামাজিক, পারিবারিক ও সমাজের ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল। আমাদের সমাজে এখনো নারীর প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠেনি। অনেক জায়গায় নারীকে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখা হয় যা এই ধরনের সহিংসতার পেছনে মানসিক ভিত্তি তৈরি করে। শুধু আইন থাকলেই অপরাধ বন্ধ হয় না, যদি না তার সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় অপরাধীদের আরও সাহস জোগায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না থাকলে অপরাধ কমে না, বরং বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। একই সঙ্গে আমাদের সমাজে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবণতা এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, যা শুধু অন্যায়ই নয়, বরং নতুন ভুক্তভোগীদের সামনে আসতে বাধা তৈরি করে। পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্মতির বিষয়গুলো যদি সঠিকভাবে শেখানো না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিকৃত মানসিকতার ঝুঁকি বাড়ে।