২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্তত পাঁচজন খেলোয়াড় টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ধর্ষণের অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছেন বা তদন্তের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে জাপানের দুজন খেলোয়াড়ও রয়েছেন, যারা দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলেছেন। কিন্তু ফিফা কেন এই খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতায় নিবন্ধনের অনুমতি দিলো? কেউ কেউ দোষী সাব্যস্ত হননি। আবার অন্যরা অভিযুক্ত হলেও এখনও বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া খেলোয়াড়দের নিবন্ধন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ফিফার কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। সংস্থাটির অবস্থান সাধারণত এমন যে, তারা বিভিন্ন দেশের বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করে এবং খেলোয়াড় নির্বাচনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জাতীয় ফেডারেশনের দায়িত্ব। যদি ফিফার পক্ষ থেকে কোনো শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো বিধিনিষেধ (আদালতের আদেশ বা অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ) না থাকে যা খেলোয়াড়কে খেলতে বাধা দেয়, তবে তিনি খেলার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন।
রায়ান মেন্ডেস (কেপ ভার্দে)
কেপ ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস এক ব্রাজিলীয় নারীর দায়ের করা ধর্ষণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিউজিল্যান্ড পুলিশের তদন্তের মুখে পড়েছেন। ওশেনিয়ায় প্রীতি ম্যাচ খেলার সময় কেপ ভার্দে দল যে হোটেলে অবস্থান করছিল, সেখানেই মার্চ মাসে ঘটনাটি ঘটেছিল এবং গত ১০ এপ্রিল থেকে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, পুলিশ হোটেলের নিরাপত্তা ক্যামেরা থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং তদন্ত শেষ করার জন্য তিন মাস আগে করা শারীরিক পরীক্ষার ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে। তদন্ত শেষে পুলিশ সিদ্ধান্ত নেবে যে, আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হবে কি না।
বিভিন্ন বার্তা থেকে জানা যায় যে, এক ব্রাজিলীয় নারী ধর্ষণের অভিযোগ জানানোর জন্য কেপ ভার্দে ফেডারেশনের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন।
নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, যৌন সহিংসতার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধের গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এই প্রতিবেদনে পুলিশকে দেওয়া আঘাতের চিহ্নের ছবি, অভিযোগের নথি এবং সেই ক্লিনিকের মেডিকেল রিপোর্ট, যেখানে ঘটনার পর ওই ব্রাজিলীয় নারীকে পরীক্ষা ও মানসিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল,সেসব তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে ফিফা বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ফিফা অসদাচরণের যেকোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং ফুটবলের সাথে জড়িত যে কারো জন্য কোনো ঘটনা সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।’
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ফিফার স্বাধীন বিচারিক সংস্থাগুলো তাদের কাছে কোনো অভিযোগ এসেছে কি না সে বিষয়ে মন্তব্য করে না, এমনকি কোনো কথিত ঘটনার বিষয়ে চলমান তদন্তের অস্তিত্ব নিশ্চিত বা অস্বীকারও করে না। কোনো তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিলে, তারা তা উপযুক্ত সময় ও উপযুক্ত পদ্ধতিতে করবে।
ফিফা নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছে। এই মুহূর্তে আমরা আর কোনো মন্তব্য করব না।
জুনিয়া ইতো (জাপান)
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপানের ৪-০ ব্যবধানের জয়ে গোল করা ফরোয়ার্ড জুনিয়া ইতো, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অভিযোগের মুখে পড়েন। সে সময় জাপানি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, ওসাকার একটি হোটেলে মদ্যপ অবস্থায় ওই খেলোয়াড় কর্তৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ জানিয়ে দুজন নারী মামলা করার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। জাপান জাতীয় দল এশিয়ান কাপের দল থেকেও জুনিয়া ইতোকে বাদ দিয়েছিল। ওই খেলোয়াড় পাল্টা অভিযোগ হিসেবে ওই দুই নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনার দায়ে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে, পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব দেখিয়ে সরকারি অভিশংসকেরা ওই খেলোয়াড় বা অভিযোগকারী কারও বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কাইশু সানো (জাপান)
২০২৫ সালে কাইশু সানো ঘোষণা করেন, ‘আমার কাজের কারণে বহু মানুষের মনে যে উদ্বেগ ও অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। এখন থেকে কথা ও কাজের মাধ্যমে অর্থাৎ আমার সাধ্যমতো সবকিছুর মধ্য দিয়ে আমি আমার দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিয়ে যাব এবং মাঠের বাইরেও সমাজের প্রতি অবদান রাখার চেষ্টা করবো।’
আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর কাইশু সানোকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। জাপানি কর্তৃপক্ষ তাকে মুক্তি দেয়, যার ফলে তিনি তার পেশাদার ক্যারিয়ার পুনরায় শুরু করার এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।
২০১৮ সাল থেকে জাপানের কোচের দায়িত্বে থাকা হাজিমে মরিয়াসু এই বিষয়ে বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই তার ক্যারিয়ারের ওপর নজর রেখেছি এবং ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কথা বলার পর আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে সে সত্যিই অনুতপ্ত। আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, কোনো ভুল করার কারণে কাউকে কি সমাজ বা ফুটবলের জগত থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেওয়া উচিত? তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, একটি পরিবারের মতো তাকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেওয়াই শ্রেয় হবে।’
আশরাফ হাকিমি (মরক্কো)
মরক্কোর তারকা খেলোয়াড় আশরাফ হাকিমির বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে ফ্রান্সে এক ২৪ বছর বয়সী নারী ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। পিএসজির এই খেলোয়াড় মামলাটি খারিজ করার আবেদন জানিয়েছিলেন, কিন্তু ভার্সাই আপিল আদালত সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। ফলে তাকে ফরাসি আদালতে এই অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। মামলাটির সূত্রপাত হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন ওই তরুণী প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা ভাল-দ্য-মার্নের একটি থানায় গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ জানান। তবে তিনি তখন কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (এফআইআর) দায়ের করেননি।
এএফপির তথ্যমতে, ইনস্টাগ্রামে ওই খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল এবং তিনি হাকিমির বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে যে, হাকিমি তার সম্মতি ছাড়াই তাকে চুম্বন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে ধর্ষণ করেন। ওই তরুণী দাবি করেন যে, তিনি কোনোভাবে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে এবং এক বন্ধুর সহায়তা নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মরক্কোর কোচ হাকিমির পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তার পাশে আছি।’
২০২৩ সালের মার্চ মাসে এই খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাকিমি প্রথমবারের মতো বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন, যখন একজন বিচারক অভিযোগগুলো আমলে নেন। এই বিষয়ে হাকিমি তার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেন, ‘আজকাল ধর্ষণের অভিযোগই বিচারের মুখোমুখি করার জন্য যথেষ্ট, এমনকি আমি তা অস্বীকার করলেও এবং সবকিছু মিথ্যা প্রমাণিত হলেও। এটি প্রকৃত ভুক্তভোগীদের মতোই নির্দোষ ব্যক্তিদের জন্যও অন্যায়। আমি শান্তভাবে এই বিচারের অপেক্ষায় আছি, যা সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরবে।’
থমাস পার্টি (ঘানা)
যুক্তরাজ্যে থমাস পার্টির বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ৭টি অভিযোগ রয়েছে। কানাডায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি পানামার বিপক্ষে ঘানার বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচটি খেলতে পারেননি। চলমান তদন্তের কারণে কানাডিয়ান কর্তৃপক্ষ তাকে ভিসা দেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এই সিদ্ধান্তটি ছিলো ‘স্বেচ্ছাচারী ও অত্যন্ত অন্যায্য’, কারণ এটি ‘অপ্রমাণিত’ অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল। কানাডিয়ান আদালত ভিসা প্রত্যাখ্যান করায় থমাস পার্টি ঘানার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি মিস করেন।
ইংল্যান্ডে আর্সেনালের হয়ে খেলার সময় ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সংঘটিত অপরাধের জন্য দুজন নারী এই খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে পাঁচবার অভিযোগ এনেছেন। এর আগে, আরেকজন নারীও তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছিলেন। ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করার ওপরও তার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আরআর/আইএন








