বিশ্বকাপ মঞ্চের মাঠে খেলায় ২২ জন ফুটবলার মুখোমুখি দাঁড়ান। গ্যালারিতে লাখো দর্শক, টেলিভিশনের ওপারে কোটি মানুষের চোখ। কিন্তু সেই মুহূর্তে পৃথিবীর কোথাও একটি পরিবার নীরবে বিভক্ত হয়ে যায় দুই ভাগে। এক ছেলের গায়ে স্পেনের জার্সি, অন্যজনের গায়ে ঘানার। একজনের জয়ে উল্লাস করলে আরেকজনের হারে বুক ভাঙে। আবার কোথাও বাবা যে স্বপ্ন একসময় পূরণ করতে পারেননি, আজ সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে নামছেন তার ছেলে। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু গোল, শিরোপা আর তারকাদের লড়াই নয়; এটি রক্তের সম্পর্ক, পারিবারিক উত্তরাধিকার আর পরিচয়েরও এক অনন্য গল্প।
আধুনিক ফুটবলে জাতীয় দলের সংজ্ঞা অনেক বদলে গেছে। জন্ম এক দেশে, বেড়ে ওঠা আরেক দেশে, আর পারিবারিক শেকড় অন্য কোথাও। সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি এবারের বিশ্বকাপ। এবারের আসরে অংশ নিয়েছেন আট জোড়া সহোদর ফুটবলার। চার জোড়া একই দেশের হয়ে খেলছেন, আর চার জোড়া প্রতিনিধিত্ব করছেন ভিন্ন দুটি দেশকে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল নয়, কিন্তু ২০২৬ আসরে এটি যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত গল্পটি ইনাকি উইলিয়ামস ও নিকো উইলিয়ামসকে ঘিরে। ঘানার অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান হলেও দুই ভাইয়ের বেড়ে ওঠা স্পেনে। বড় ভাই ইনাকি নিজের পারিবারিক শেকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঘানার জার্সি বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে ছোট ভাই নিকো খেলছেন স্পেনের হয়ে। দুই ভাইয়ের স্বপ্ন একই — বিশ্বকাপ জেতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ দুটি ভিন্ন দেশের পতাকার নিচে। ফুটবল এখানে শুধু একটি খেলা নয়, নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ারও গল্প।
একই রকম আবেগ ছড়িয়ে আছে দেজিরে দুয়ে ও গুয়েলা দুয়ের পরিবারেও। ফ্রান্সে বড় হওয়া দুই ভাইয়ের একজন ফ্রান্সের, অন্যজন আইভরি কোস্টের হয়ে বিশ্বকাপ খেলছেন। একই ঘরে বড় হওয়া দুই ভাই যখন দুই জাতীয় সংগীতের সামনে দাঁড়ান, তখন বোঝা যায় — রক্তের সম্পর্কের চেয়ে জাতীয় পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা নয়।
তবে সব গল্পে বিভাজন নেই। কিছু গল্পে আছে একসঙ্গে পথচলার আনন্দ। ফ্রান্সের লুকাস হার্নান্দেজ ও থিও হার্নান্দেজ, নেদারল্যান্ডসের জুরিয়েন টিম্বার ও কুইন্টেন টিম্বার, কেপ ভার্দের দেরয় দুয়ার্তে ও লারোস দুয়ার্তে, এবং কুরাসাওয়ের লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও জুনিনিয়ো বাকুনা একই দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলছেন। ছোটবেলায় একই মাঠে বল কিক করা দুই ভাই আজ বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে একই পতাকার জন্য লড়ছেন। একজনের সফল ট্যাকলে অন্যজনের উচ্ছ্বাস কিংবা একজনের গোলে আরেকজনের আলিঙ্গন, এ যেন ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর পারিবারিক ছবি।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্প শুধু ভাইদের নয়, বাবাদেরও। আর্জেন্টিনার তরুণ মিডফিল্ডার নিকো পাজ যেন সময়কে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দিচ্ছেন। তার বাবা পাবলো পাজ ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছিলেন। প্রায় তিন দশক পর সেই একই নীল-সাদা জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলছেন ছেলে। একটি পরিবার, দুটি প্রজন্ম, একটাই স্বপ্ন আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচূড়ায় দেখা। বিশ্বকাপে এর চেয়ে বড় উত্তরাধিকারের গল্প আর কী হতে পারে?
একইভাবে আর্জেন্টিনার আরেক তরুণ জিওলিয়ানো সিমিওনে বহন করছেন তার বাবা ডিয়েগো সিমিওনের অসমাপ্ত স্বপ্ন। খেলোয়াড় হিসেবে ডিয়েগো তিনটি বিশ্বকাপ খেললেও শিরোপা জেতা হয়নি। এখন ছেলের প্রতিটি দৌঁড়, প্রতিটি গোলের সুযোগ আর প্রতিটি জয় যেন বাবার অপূর্ণ স্বপ্নকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখছে। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে একজন কিংবদন্তি কোচের চোখে তখন আর কৌশল থাকে না, থাকে শুধু একজন বাবার গর্ব।
এই অসাধারণ কাহিনীর শিকড় লুকিয়ে আছে ১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মে, যখন আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছিল।
সেবার দলে নির্বাচিত খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন ডিয়েগো সিমিওনে এবং পাবলো পাজ। সিমিওনে তখন থেকেই দলের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন, যিনি তার নেতৃত্ব, খেলার তীব্রতা এবং কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার জন্য পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, পাজ ছিলেন স্কোয়াডের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, যিনি আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে বড় অবদান রেখেছিলেন।
যদিও আর্জেন্টিনার সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত হতাশায় শেষ হয়েছিল, তবুও টুর্নামেন্টটি ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে এবং এই দুই ফুটবলারের ক্যারিয়ারেরই একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয়।
সেই সময় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, প্রায় ত্রিশ বছর পর তাদেরই সন্তানেরা একই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে একসাথে দাঁড়াবে।
বিখ্যাত বাবাদের সঙ্গে তুলনা হওয়াটা অনিবার্য হলেও, জিওলিয়ানো সিমিওনে এবং নিকো পাজ নিজেদের পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তাদের অন্তর্ভুক্তি কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং তাদের বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং ক্রমাগত উন্নতিরই প্রতিফলন
বিশ্বকাপে এমন গল্প অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে জার্মানির জেরোম বোয়াটেং ও ঘানার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং দুই ভাই দুই ভিন্ন দেশের হয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই ম্যাচ প্রমাণ করেছিল, ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু পরিবারের বন্ধন কখনো ভাঙে না। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই গল্পগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্বকাপ শেষে মানুষ মনে রাখবে কে ট্রফি জিতলো, কে গোল্ডেন বুট পেলো, কোন দল ইতিহাস গড়লো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি স্মৃতিও থেকে যাবে। সেটি হলো — একই পরিবারের দুই ভাই দুই দেশের জন্য লড়েছেন, একজন বাবা গ্যালারিতে বসে ছেলের চোখে নিজের স্বপ্ন দেখেছেন, আর একটি পরিবার বুঝিয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু প্রতিযোগিতা নয়, সম্পর্কও।
এ কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি প্রমাণ করছে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় গল্প অনেক সময় স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। লেখা থাকে একটি পরিবারের ইতিহাসে, বাবার চোখের অশ্রুতে, দুই ভাইয়ের আলিঙ্গনে এবং একটি জার্সি থেকে আরেকটি জার্সিতে ছড়িয়ে পড়া উত্তরাধিকারের গল্পে।
টিটিটি/আইএন








