চায়ের দোকান মানেই আড্ডা, কোলাহল কিংবা রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক—এমন ধারণাই প্রচলিত। তবে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার একটি গ্রামের বাজারে সেই চেনা চিত্র বদলে দিয়েছে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এখানে ধূমায়িত চায়ের পেয়ালায় চুমুকের সঙ্গে চলছে বই পড়া। কেউ চা পান করতে করতে বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার গল্প, উপন্যাস কিংবা ইতিহাসের বইয়ে ডুবে কাটিয়ে দিচ্ছেন অবসর সময়। ফলে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের জ্ঞানচর্চার মিলনকেন্দ্র।

উপজেলার রূপনারায়ণকুড়া ইউনিয়নের মাথাফাটা বাজারে অবস্থিত ‘খোকন কফি হাউস ও পথ পাঠাগার’ এখন শুধু চা-কফির দোকান নয়, বইপ্রেমীদেরও প্রিয় ঠিকানা। দোকানের এক পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, জীবনী, উপন্যাস, গল্প, বিজ্ঞান ও আত্ম উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ের শতাধিক বই। প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে বসে বই পড়েন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণদের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পাঠাগারের উদ্যোক্তা তৌফিকুর রহমান খোকন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সেখান থেকেই বই পড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তিনি বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখেন। পরে নিজের সেই অভ্যাস সমাজে ছড়িয়ে দিতে এবং তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করতে ২০২৫ সালে নিজের চায়ের দোকানের পাশেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘পথ পাঠাগার’।

শুরুর দিকে অল্প কয়েকটি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে পাঠাগারটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। এখন শুধু বইপ্রেমীরাই নন, চা পান করতে আসা সাধারণ ভোক্তারাও কিছু সময় বইয়ের সঙ্গে কাটান। অনেকের মতে, মোবাইল ফোনে সময় কাটানোর পরিবর্তে বই পড়ার এমন সুযোগ তরুণদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।

স্থানীয়দের কাছ থেকে বই সংগ্রহ এবং বইপ্রেমীদের দানের মাধ্যমে পাঠাগারের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তার আশা—ভবিষ্যতে আরও নতুন বই যুক্ত করে পাঠাগারটিকে বড় পরিসরে গড়ে তোলা হবে।

পাঠাগারটির নিয়মিত পাঠক রাসেল মিয়া বলেন, ‘গ্রামের একটি চায়ের দোকানে এমন পাঠাগার সত্যিই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এখানে এসে বই পড়তে খুব ভালো লাগে। অনেক তরুণ এখন বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তরুণ সমাজ আরও বেশি বইমুখী হবে।’

স্থানীয় সংগঠক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে মোবাইল ফোনের আসক্তি বেড়েছে। আবার চা-কফির দোকান মানেই সাধারণত রাজনৈতিক আড্ডার জায়গা। সেখানে খোকনের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এটি তরুণদের বইমুখী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।’

উদ্যোক্তা তৌফিকুর রহমান খোকন বলেন, ‘মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেক তরুণ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছি। কেউ যদি চা খেতে এসে অন্তত কয়েক পৃষ্ঠা বই পড়ে, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে আরও নতুন বই সংগ্রহ করে পাঠাগারটিকে বড় পরিসরে গড়ে তুলতে চাই।’