রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার ব্যস্ততা এখন আগের মতোই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে ছুটে চলছে পণ্যবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস আর মানুষের নিরন্তর যাতায়াত। ফ্লাইওভারের নিচে দোকান খুলেছে, ফুটপাতে ফিরেছে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে এখনও লুকিয়ে আছে এক অস্থির সময়ের স্মৃতি। কোথাও দেওয়ালে গুলির দাগ, কোথাও স্মৃতিফলকে খোদাই করা কয়েকশত নাম, আবার কোথাও কোনো শহীদের বাবা আজও ছেলের স্মৃতিতে চোখ ভেজান।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সেই দিনগুলোতে যাত্রাবাড়ী ছিল দেশের সবচেয়ে আলোচিত সংঘর্ষস্থলগুলোর একটি। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই আজ এলাকাটিকে বলেন ‘জুলাই বিপ্লবের স্ট্যালিনগ্রাদ’। ইতিহাসের বিখ্যাত স্ট্যালিনগ্রাদের মতো এখানেও ছিল দীর্ঘ প্রতিরোধ, ব্যারিকেড, বারবার সংঘর্ষ এবং যে করেই হোক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা। যদিও এটি একটি রূপক তুলনা, তবু আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের কাছে যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তাদের ভাষ্য, যাত্রাবাড়ী ছিল কেবল একটি মোড় নয়; এটি ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, সিলেটমুখী যান চলাচল এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজধানীতে আসা পণ্যবাহী পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়েই চলাচল করে। আন্দোলনের সময় এই পথ অচল করে দিলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে—এমন ধারণা থেকেই যাত্রাবাড়ীকে অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

জুলাই বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ যাত্রাবাড়ী২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার চিত্র/ফাইল ছবি: জাগো নিউজ

১৭ জুলাই: প্রতিরোধের মোড় ঘোরার দিন

জুলাই বিপ্লব পরিষদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় ১৭ জুলাই থেকে। তার ভাষায়, ‘আমরা ১৭ জুলাইকে যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধ দিবস বলি। কারণ, সেদিন থেকেই এখানে এমন এক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘদিন ভাঙা যায়নি। আমাদের বিশ্বাস, এই প্রতিরোধ না হলে আন্দোলনের গতি এত দ্রুত এগোত না।’

১৭ জুলাইয়ের পর যাত্রাবাড়ীর চিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে। শুরুতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ আন্দোলন রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়।

আরও পড়ুন

গণঅভ্যুত্থান স্মৃতিতে অগ্নিগর্ভ যাত্রাবাড়ী

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আন্দোলন তখন আর শুধু একটি দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অনেকের কাছে এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়।

জুলাই বিপ্লব পরিষদের আহ্বায়ক সৌরভ হোসেন ফাহিম বলেন, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামেন। পরে মাদরাসার শিক্ষার্থী, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষও যুক্ত হন।

সৌরভের ভাষায়, ‘কেউ কাউকে ফোন করে আনেনি। ভাইয়ের রক্ত, মায়ের কান্না আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভই মানুষকে রাস্তায় নিয়ে এসেছে।’

জুলাই বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ যাত্রাবাড়ী২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নেমে আসে সর্বস্তরের জনতা/ফাইল ছবি: জাগো নিউজ

মানুষের অংশগ্রহণেই গড়ে ওঠে প্রতিরোধ

যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসা থাকায় অল্প সময়েই আন্দোলনের বড় একটি জনভিত্তি তৈরি হয়। দিনের পর দিন সংঘর্ষের মধ্যেও নতুন নতুন মানুষ রাস্তায় যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, কারফিউ ঘোষণার পরও অনেকেই ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধে অংশ নেন।

সৌরভ হোসেন ফাহিম বলেন, এটি ছিল কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, দিনমজুর, দোকানদার, রিকশাচালক, শিক্ষক, অভিভাবক—সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। কেউ ব্যারিকেডে দাঁড়িয়েছেন, কেউ আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, কেউ ছাদ থেকে পানির বোতল ছুড়ে দিয়েছেন, আবার কেউ নিজের বাড়ির দরজা খুলে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘যার কাছে ১০ টাকা ছিল, তিনি এক বোতল পানি কিনে দিয়েছেন। যার কিছুই ছিল না, তিনি নিজের বাসা থেকে বোতলে পানি ভরে ছুড়ে দিয়েছেন। সবাই কোনো না কোনোভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

জুলাই বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ যাত্রাবাড়ী২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার চিত্র/ফাইল ছবি: জাগো নিউজ

ব্যারিকেড ছিল প্রতিরোধের প্রাণ

প্রতিরোধের অন্যতম বড় শক্তি ছিল ব্যারিকেড। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন আড়াআড়িভাবে রেখে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোথাও ইট, বাঁশ ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে পথ আটকে দেওয়া হয়। আবার কোথাও মুহূর্তের মধ্যে ব্যারিকেড সরিয়ে নতুন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হতো।

মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, যাত্রাবাড়ীর ভৌগোলিক অবস্থানও আন্দোলনকারীদের পক্ষে কাজ করেছে। প্রধান সড়কের সঙ্গে অসংখ্য গলি ও উপগলি থাকায় সংঘর্ষের সময় মানুষ দ্রুত সরে যেতে পারতেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আবার মূল সড়কে ফিরে এসে অবস্থান নিতেন। এই ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কৌশল দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

তার দাবি, একাধিকবার অভিযান চালিয়েও পুরো এলাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংঘর্ষের পর মানুষ গলি-উপগলিতে সরে যেত, আবার সুযোগ পেলেই মূল সড়কে ফিরে আসত।

আরও পড়ুন

বিবিসি আইয়ের অনুসন্ধান / হাসিনার পতনের পরও যাত্রাবাড়ীতে ৫২ জনকে হত্যা করে পুলিশ

আহতদের পাশে ছিল সাধারণ মানুষ

আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকাবাসীর সহায়তা ছিল প্রতিরোধের অন্যতম ভিত্তি। কেউ আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, কেউ পানির বোতল পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ নিজের বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছেন। অনেক নারী ছাদ থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিচে পাঠিয়েছেন। দোকানদাররা খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ছোট ছোট বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও অনেক আহতকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে স্বেচ্ছাসেবী দলও গড়ে ওঠে।

জুলাই বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ যাত্রাবাড়ীযাত্রাবাড়ী থানা/ছবি: জাগো নিউজ

 

৫ আগস্টের সকাল

৫ আগস্টের সকাল। যাত্রাবাড়ীর আকাশে তখনও অনিশ্চয়তা। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল উত্তেজনা, উদ্বেগ আর প্রতীক্ষা। কেউ জানতেন না দিনটি কীভাবে শেষ হবে। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকের ভাষ্য, সেদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে তারা এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই বের হয়েছিলেন।

আহত আন্দোলনকারী হাফেজ মোহাম্মদ হোসাইন আহমেদ বলেন, ‘আমি আর আমার দুই ভাই সকালে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হই। মাকে বলেছিলাম—হয় ফিরে আসব, নয়তো আর ফিরব না। তখন মনে হচ্ছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’

আরও পড়ুন

ফাঁস হওয়া অডিও যাচাই বিবিসির / জুলাইয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা

হোসাইন আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ীতে পৌঁছে চারদিকে আহত মানুষের দৃশ্য দেখেন। পরে কয়েকজন মিলে গুলির উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। তার ডান হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরে চিকিৎসকেরা সেটি কেটে ফেলতে বাধ্য হন।

আজও এক হাত নিয়েই জীবনযাপন করছেন হোসাইন। কিন্তু তার কণ্ঠে অনুশোচনার চেয়ে বেশি শোনা যায় সেই দিনের স্মৃতি।

হোসাইন আহমেদ বলেন, ‘হাত হারিয়েছি, কিন্তু বিশ্বাস হারাইনি। শুধু চাই, যারা প্রাণ দিয়েছে বা আহত হয়েছে, তাদের ত্যাগ যেন মানুষ ভুলে না যায়।’

জুলাই বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ যাত্রাবাড়ী২০২৪ সালে ‍যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতিফলক/ছবি: জাগো নিউজ

শহীদের বাবার অপেক্ষা

যাত্রাবাড়ীর আরেক প্রান্তে এখনও বুকভরা শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছেন শহীদ দীন ইসলাম বেপারীর বাবা শাহ আলম বেপারী। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যায় তার কণ্ঠ।

শাহআলম বেপারী বলেন, “আমার ছেলে হাফেজ ছিল। পড়াশোনা করত কুতুবখালী বড় মাদরাসায়। যেদিন খবর পেলাম, আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। ছাত্ররা আমাকে ধরে বলেছিল, ‘চাচা, কাঁদবেন না। আপনার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। আজ থেকে আমরাই আপনার ছেলে।’ সেই কথাগুলো এখনও কানে বাজে।”

তিনি আরও বলেন, তাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় চাওয়া কোনো আর্থিক সহায়তা নয়; বরং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নিহতদের যথাযথ মূল্যায়ন।

শাহআলম বেপারীর ভাষায়, ‘আমরা চাই, যারা আর ফিরে আসবে না, তাদের আত্মত্যাগ যেন রাষ্ট্র মনে রাখে। বিচার যেন শেষ পর্যন্ত হয়।’

জুলাই বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য ‘স্ট্যালিনগ্রাদ’ যাত্রাবাড়ীযাত্রাবাড়ীতে জুলাই শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ/ফাইল ছবি

স্মৃতির ভেতর বেঁচে আছে যাত্রাবাড়ী

আজ যাত্রাবাড়ীর রাস্তায় আর কোনো ব্যারিকেড নেই। ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা সেই সড়ক দিয়ে এখন ছুটে চলে যানবাহন। যে মোড়ে একদিন সংঘর্ষ হয়েছে, সেখানেই আজ দোকান খুলেছে। কিন্তু স্মৃতি মুছে যায়নি।

কেউ এখনও দেখিয়ে দেন কোন ভবনের ছাদ থেকে গুলি এসেছিল বলে তাদের বিশ্বাস। কেউ থেমে যান সেই মোড়ে, যেখানে শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখেছিলেন। আবার কেউ স্মৃতিফলকে খুঁজে নেন হারিয়ে যাওয়া একটি নাম।

যাত্রাবাড়ীর অলিগলি ঘুরলে আজও চোখে পড়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া স্লোগান, কোথাও গুলির দাগ, কোথাও শহীদদের স্মৃতিফলক। সময় পেরিয়ে গেলেও এলাকাটির পরিচয় যেন কেবল একটি জনবহুল মোড়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন অনেকের কাছে জুলাই আন্দোলনের প্রতিরোধের এক প্রতীকী ভূখণ্ড।

আরও পড়ুন

জুলাই বিপ্লব / যাত্রাবাড়ীতে শহীদদের নামে স্মৃতিফলক উন্মোচন

ট্রাইব্যুনালে হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষ্য / যাত্রাবাড়ীতে সেদিন কী ঘটেছিল, জানালেন খোকন চন্দ্র

তবে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দেন, কোনো আন্দোলনের গুরুত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু একটি এলাকাকে নয়, সারা দেশের ঘটনাপ্রবাহ, বিভিন্ন অঞ্চলের অবদান এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেও বিবেচনায় নিতে হয়।

তবু যাত্রাবাড়ীর মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস করেন, জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে এই জনপদ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল।

সেই কারণেই আজও যাত্রাবাড়ীর নাম উচ্চারিত হলে অনেকের মনে ভেসে ওঠে একটি শব্দ—‘স্ট্যালিনগ্রাদ’। এটি কেবল একটি উপমা নয়; অংশগ্রহণকারীদের কাছে এটি প্রতিরোধ, ত্যাগ, বেদনা এবং এক অস্থির সময়ের স্মৃতির আরেক নাম।

এমএমএআর/