ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম অবিশ্বাস্য, রোমাঞ্চকর ও অবর্ণনীয় এক ম্যাচ রচিত হলো সিয়াটলে। নকআউট পর্বের ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিতে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারাল বেলজিয়াম। রেড ডেভিলদের এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের নায়ক ইউরি তিলেমানস, যাঁর জোড়া গোল ভেঙে দেয় সেনেগালের হৃদয়।

শুরুতে গতি আর শারীরিক শক্তির ঝড় তোলে সেনেগাল। ২৪ মিনিটে ইসমাইলা সারের হেড পোস্টে লাগলেও ফিরতি শটে দারুণ এক গোল করে সেনেগালকে এগিয়ে দেন হাবিব দিয়ারা। প্রথমার্ধে বেলজিয়ামের আক্রমণভাগ ছিল ধারহীন। বিরতির পর বেলজিয়ান কোচ রুডি গার্সিয়ার সব পরিকল্পনা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ৫১ মিনিটে ব্যবধান ২-০ করেন ইসমাইলা সার। ব্র্যান্ডন মেচেলের ভুলের সুযোগ নিয়ে মুসা নিয়াখাতের দেওয়া দূরপাল্লার পাস থেকে দুর্দান্ত এক হাফ-ভলিতে থিবো কোর্তোয়াকে পরাস্ত করেন তিনি।

গ্যালারিতে তখন বেলজিয়ান সমর্থকদের স্তব্ধতা, গত বিশ্বকাপের মতো করুণ বিদায়ের ভবিষ্যৎ যেন উঁকি দিচ্ছিল। ম্যাচ যখন ৫৯ মিনিটে গড়ায়, তখন দলের সেরা তারকা কেভিন ডি ব্রুইনা ও জেরেমি ডকুকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ গার্সিয়া, যা দলের ভেতর ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

৭২ মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেকে ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক অভাবনীয় দৃশ্য। মাঠের মধ্যেই তীব্র বাকবিতণ্ডা এবং এক পর্যায়ে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন বেলজিয়ামের দুই সতীর্থ লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড ও ইউরি তিলেমানস। দেখে মনে হচ্ছিল, শুধু ম্যাচ নয়, বেলজিয়ামের দলটাই যেন ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত এই ক্ষোভই তাদের ভেতরে এক অদ্ভুত জেদ জ্বালিয়ে দেয়।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৮৬ মিনিট। বেলজিয়ামের ফুটবল স্বপ্নের শেষ প্রদীপটা যখন প্রায় নিভে এসেছে, তখনই দৃশ্যপটে হাজির বদলি নামা রোমেলু লুকাকু। থমাস মুনিয়েরের বুদ্ধিদীপ্ত পাস থেকে নিখুঁত ফিনিশে তিনি ব্যবধান করেন ২-১। তাতে বেলজিয়াম সমর্থকদের প্রাণের স্পন্দন ফেরে। কিন্তু আসল নাটক তো বাকি ছিল ৮৯ মিনিটে! যে ট্রোসার্ড আর তিলেমানস একটু আগে মাঠের মধ্যে একে অপরের দিকে তেড়ে যাচ্ছিলেন, সেসব ভুলে এক হতে সময় নিলেন না। ট্রোসার্ডের চমৎকার এক ক্রস বাতাসে ভেসে এলে দূরের পোস্টে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করেন তিলেমানস!

মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে ম্যাচ রূপ নিল ২-২ গোলের সমতায়। ৯০ মিনিট পেরিয়ে এরপর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ক্লান্তি আর স্নায়ুর চাপের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছিল তখন দুই দলে। অতিরিক্ত সময়ের ১১৮ মিনিটে মোরেরার নিচু ক্রস থেকে ১০ গজ দূর থেকে নেওয়া লুকেবাকিওর শটটি গোলবারে লেগে ফিরে আসে। তবে বল লুকেবাকিওর কাছে পৌঁছানোর আগেই বক্সে তিলেমানসকে ফাউল করেন কামারা। যদিও রেফারিকে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিতে হয় ভিএআর দেখে। তাতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সেনেগালের খেলোয়াড়েরা। মাঠে শুরু করেন হট্টগোল। সেনেগালের সিসে পেনাল্টি মারার জায়গায় মাথা চেপে শুয়ে পড়েন এবং জ্যাকসন রেফারিকে কনুইয়ের আঘাতের কথা বলে তীব্র প্রতিবাদ জানান। শেষ পর্যন্ত সব বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ১২৫তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ান তিলেমানস। পরে আর চেষ্টা করেও ম্যাচে ফিরতে পারেনি সেনেগাল। সিয়াটলের মাঠ তাই ভারী হয়ে ওঠে তাদের কান্নায়।