রুপালি পর্দার গল্পকে অনেক সময় হার মানিয়ে দেয় বাস্তব জীবন। দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী শ্রুতি কৃষ্ণর জীবনও ঠিক তেমনই। তিন দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় করে তিনটি রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ১৫০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু তাঁর অভিনয়জীবনের চেয়েও বেশি কৌতূহলের জন্ম দেয় তাঁর পারিবারিক গল্প।
শ্রুতি এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে তাঁর একজন নয়, দুজন মা। আরও অবাক করার বিষয় হলো, আজও তিনি জানেন না, এই দুই মায়ের মধ্যে কে তাঁর জৈবিক মা। শুধু তিনিই নন, তাঁর ভাইবোনেরাও জানেন না তাঁদের জন্মদাত্রী কে। অথচ এ প্রশ্নের উত্তর জানার প্রয়োজনও তাঁরা কখনো অনুভব করেননি।
যেভাবে শুরু
শ্রুতি কৃষ্ণর জন্মনাম গিরিজা। তিনি জন্মেছিলেন কর্ণাটকের একটি নাট্যশিল্পী পরিবারে। তাঁর বাবা জি ভি কৃষ্ণ ছিলেন একটি নাট্যদলের মালিক। সেই দলের সদস্য ছিলেন যমজ দুই বোন রাধা ও রুক্মিণী। পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণ দুজনকেই বিয়ে করেন। এই দম্পতির সংসারে জন্ম নেয় তিন সন্তান—শ্রুতি, অভিনেতা শরণ ও উষা। পরিবারের সদস্যরা কখনো প্রকাশ করেননি কোন সন্তানের জন্ম কোন মায়ের গর্ভে। সন্তানদের কাছেও বিষয়টি গোপন রাখা হয়।
শ্রুতি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। কারণ, দুই মা–ই তাঁদের সমান ভালোবাসা দিয়েছেন।
শ্রুতির ভাষায়, ‘উত্তর জানতে চাইলে হয়তো একটি প্রশ্ন করলেই জানা সম্ভব। কিন্তু আমাদের কখনো সেই প্রয়োজন হয়নি। আমরা আলাদা নই। দুজনই আমাদের মা। তাঁরা আমাদের সমান ভালোবাসেন, আমরাও তাঁদের সমান ভালোবাসি।’

১৪ বছরেই অভিনয়ে
মাত্র ১৪ বছর বয়সে অভিনয়ে নাম লেখান গিরিজা। ১৯৯০ সালের ‘নাম্বিড়ে নাম্বি বিট্রে বিড়ি’ ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন। তখন তাঁর পর্দার নাম ছিল ‘প্রিয়দর্শিনী’। কিন্তু নামটি তাঁর নিজের পছন্দ ছিল না। পরে পরিচালক দ্বারকিশের ‘শ্রুতি’ ছবিতে অভিনয়ের সময় তিনি নতুন নাম নেন—‘শ্রুতি’। ছবিটি সুপারহিট হয়। সেই সঙ্গে বদলে যায় তাঁর ক্যারিয়ারও। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে তিনি কর্ণাটকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকায় পরিণত হন।
‘ট্র্যাজেডি কুইন’ হওয়ার গল্প
শুধু বাণিজ্যিক সাফল্য নয়, অভিনয়দক্ষতার জন্যও প্রশংসিত হন শ্রুতি। আবেগঘন চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের কারণে তিনি ‘কন্নড় সিনেমার ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে পরিচিতি পান। ১৯৯৪ সালে ‘আঘাথা’ ছবির জন্য প্রথমবার কর্ণাটক রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান। পরে ‘গৌড়ু’ ছবির জন্য আবারও একই পুরস্কার জেতেন।
এ ছাড়া কে বালাচন্দর পরিচালিত তামিল ছবি ‘কালকি’-তে অভিনয়ের জন্য পান তামিলনাড়ু রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৫০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। কাজ করেছেন বিষ্ণুবর্ধন, আম্বারিশসহ দক্ষিণ ভারতের বহু জনপ্রিয় তারকার সঙ্গে।
মালয়ালম দর্শকের ‘আম্বিলি’
যদিও মালয়ালম চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল সীমিত, তবু দর্শকদের কাছে তিনি আজও পরিচিত ‘কোট্টারাম ভিটিলি আপ্পুট্টান’ সিনেমায় ‘আম্বিলি’ চরিত্রের জন্য। ১৯৯৭ সালে মামুট্টি অভিনীত ‘ওরাল মাথরাম’ দিয়ে মালয়ালমে অভিষেক হয় তাঁর। পরে ‘কোট্টারাম ভিটিলি আপ্পুটান’ ছবিতে জয়ারামের বিপরীতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পান।

ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়
ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে পরিচালক এস মহেন্দ্রকে বিয়ে করেন শ্রুতি। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। কিন্তু ১১ বছরের দাম্পত্যের পর তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালে সাংবাদিক ও কবি চক্রবর্তী চন্দ্রচূড়কে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে সেই সংসারও মাত্র এক বছরের মধ্যে ভেঙে যায়।
রাজনীতিতেও সক্রিয়
অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় শ্রুতি। তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্য। কর্ণাটক নারী ও শিশু উন্নয়ন করপোরেশন এবং কর্ণাটক পর্যটন উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি ‘বিগ বস কন্নড়’-এর তৃতীয় আসরের বিজয়ী।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে








