টানা অতি ভারি বর্ষণ এবং উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ জনপদ আজ মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল ও কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে রেললাইন নির্মাণের কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হওয়া এবং অপরিকল্পিত স্লুইসগেট ব্যবস্থার যে অভিযোগ স্থানীয়রা তুলছেন, তা আমাদের উন্নয়ন দর্শনের এক বিরাট ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে আসা নির্মম বাস্তবতা। একদিকে আশ্রয়হীন মানুষের হাহাকার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, অন্যদিকে দেশের দুর্যোগ মোকাবিলা ও আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জরাজীর্ণ ও জোড়াতালির চিত্র আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন না করে পারে না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের চিরসঙ্গী হলেও সেই দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার যান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। একটি দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্রে পাঁচটি রাডারের মধ্যে চারটিই অচল থাকা এবং শুধু রংপুরের একটি রাডারের ওপর ভরসা করে পুরো দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করা প্রকারান্তরে অন্ধের হাতি দেখার শামিল। সামান্য ঝড়ে ঢাকার রাডারটি অচল হয়ে পড়ে থাকা এবং ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত বজ্রপাত সেন্সরগুলোর অকার্যকারিতাও প্রমাণ করে-রাষ্ট্রীয় সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের অবহেলা কতটা প্রকট। উন্নত বিশ্ব যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস দিচ্ছে, সেখানে আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরকে ধার করা আন্তর্জাতিক ডেটা এবং বিমানবাহিনীর রাডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ, জানমালের ক্ষতি কমানোর যে সুযোগটি আমরা পেতাম, তা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
এই স্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের জোড়াতালির নীতি থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও ঢাকার অচল রাডারগুলো মেরামত বা প্রয়োজনে নতুন প্রজন্মের উচ্চ রেজ্যুলেশনের ডপলার রাডার স্থাপন এবং নিজস্ব ডেটা সিমুলেশন ও সুপার কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ তরুণদের যুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলোর জন্য বন্যা পূর্বাভাসের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সমন্বয় সাধন করা জরুরি। রেললাইন বা সড়ক নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত কালভার্ট যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি প্রভাবশালী মহলের বন্ধ করে রাখা স্লুইসগেটগুলো উন্মুক্ত করা এবং পাহাড়ি নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করাও আবশ্যক।
দুর্যোগকে আমরা রুখতে পারব না; কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আর দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। সরকার উদ্বারকাজ ও ত্রাণ বিতরণের সাময়িক তৎপরতার পাশাপাশি আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাসের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোকে জোড়াতালিমুক্ত করে একটি আধুনিক ও টেকসই সুরক্ষাবলয় গড়ে তুলবে, এটাই প্রত্যাশা।








