সিলেটের একটি ছিমছাম অফিস। একদিকে থরে থরে সাজানো বইপত্র, কি-বোর্ড, মাউস আর মেধা খাটিয়ে তৈরি করা নানান ডিজাইনের পোস্টার-ক্যালেন্ডার। অন্যদিকে নিজের হাতে আঁকা নানা রঙের ক্যালিগ্রাফি। মনোরম এই অফিসের এক কোণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার স্ক্রিনে চলছে এআই প্রম্পটিংয়ের কারুকাজ। টেবিলের ওপাশে হাসিমুখে বসে আছেন তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমী ইনাম বিন সিদ্দিক। তাঁর চোখে আগামীর স্বপ্ন আর কথায় এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
ইনাম বিন সিদ্দিক মূলত একজন আলেম, গ্রাফিক ডিজাইনার, উদ্যোক্তা, ভিডিও এডিটর এবং ‘এআই তালিম’-এর কোর্সের ইনস্ট্রাক্টর। বলা যায় হাজারো তরুণের ডিজিটাল মেন্টর। ডিজিটাল যুগে যখন প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে কোনো দেয়াল থাকতে পারে না। প্রযুক্তির এই জোয়ারে ইসলামিক মূল্যবোধসম্পন্ন তরুণেরা যেন পিছিয়ে না পড়েন, সেই তাগিদ থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এআই তালিম’।
ইনাম বিন সিদ্দিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর ‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তা করার ক্ষমতা। যেখানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি থেকে দূরে ভাবা হতো, সেখানে তিনি ‘এআই তালিম’-এর মতো আইডিয়া নিয়ে এসেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, সময়ের দাবি মেটাতে হলে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার জানলেই হবে না, সেটি নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই যে ‘টেকনোলজি প্লাস ট্র্যাডিশন’-এর সমন্বয়, এটাই তাঁর মেধার স্বাক্ষর।
ইনাম বিন সিদ্দিক একজন দক্ষ ট্রেইনারও। প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জটিল সব এআই টুলসকে অত্যন্ত সহজ ভাষায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তাঁর লেকচার এবং কোর্সের মডিউলগুলো দেখলে বোঝা যায়, তিনি প্রযুক্তির গভীরতা এবং এর ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে কতটা সচেতন।
মাদ্রাসার গণ্ডি পেরিয়ে কীভাবে তিনি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাদুকর হয়ে উঠলেন, তা জানতেই আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আজ আর বিলাসিতা নয়, বলা যায় জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এই প্রযুক্তি যদি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি হয়ে উঠতে পারে জীবনবিধ্বংসী এক শক্তি। ঠিক এই জায়গাতেই ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন সিলেটের তরুণ উদ্যোক্তা ও কোর্স ইনস্ট্রাক্টর ইনাম বিন সিদ্দিক। তাঁর হাত ধরেই তৈরি হয়েছে ইসলামিক মূল্যবোধভিত্তিক প্রযুক্তিশিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ‘এআই তালিম’।
অল্প সময়ে এই কোর্স যেন একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রযুক্তির খুঁটিনাটি শেখানো হয় ইমান, নৈতিকতা ও হালাল জীবিকার দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর কোর্সে শিক্ষার্থীরা শিখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মৌলিক ধারণা, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজাইন ও কনটেন্ট তৈরি, ভিডিও জেনারেশন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়, সেটি হলো হালাল ইনকামের বাস্তবসম্মত পথ।
মূলত এআই তালিমের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন নিয়ে, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা, যাতে তারা হালাল উপায়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।
এই স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। কোর্সটি চালুর পর থেকে দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এরই মধ্যে হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন, যাঁদের বড় একটি অংশ মাদ্রাসার ছাত্র ও বেকার যুবক।
ইনাম বিন সিদ্দিক শিক্ষার্থীদের শুধু এআই টুল ব্যবহার শেখাচ্ছেন না, বরং শেখাচ্ছেন নৈতিকতা। ২০টির বেশি আধুনিক এআই টুল শেখানোর পাশাপাশি তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন ‘হালাল ইনকাম আইডিয়া’র ওপর। কীভাবে এআই ব্যবহার করে ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা ডিজিটাল ব্যবসার মাধ্যমে হালাল রুজি অন্বেষণ করা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ তৈরি করে দিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হালাল আয়ের পথেও এগিয়ে যাচ্ছেন।
ইনাম বিন সিদ্দিকের স্বপ্ন থেমে নেই। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক ইসলামিক মোবাইল অ্যাপ ‘স্মার্ট মুয়াল্লিম’ তৈরির কাজ চলছে। যেখানে কোরআনের আমপারা, দোয়া, কুইজসহ নানা ফিচার থাকবে আধুনিক ইন্টারফেসে। প্রিমিয়াম মডেলে তৈরি এই অ্যাপ ভবিষ্যতে ইসলামিক শিক্ষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
ইনাম বিন সিদ্দিক আরও জানান, তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে এআই তালিমকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা, আরও উন্নত মডিউল সংযোজন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব মার্কেটপ্লেস তৈরি এবং এমনকি ইসলামিক এআই ডিভাইস তৈরি করা।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করছে, কেউ কনটেন্ট ক্রিয়েশন করছে। কেউ আবার ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষতা অর্জন করছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তাঁরা এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথও খুঁজে পাচ্ছে।
উদ্যোক্তা ইনাম বিন সিদ্দিক তাঁর লক্ষ্য সম্পর্কে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি চাই শিক্ষার্থীরা এমন একটি দক্ষতা অর্জন করুক, যার মাধ্যমে তারা হালালভাবে উপার্জন করতে পারে এবং প্রযুক্তির দুনিয়ায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ইনাম বিন সিদ্দিক জানান, খুব শিগগির সকল লার্নারকে নিয়ে দিনব্যাপী একটি বিশেষ ‘আইটি প্রোগ্রাম’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। যেখানে থাকবে জমজমাট আইটি আড্ডা, বিশেষ সেশন, শিক্ষার্থীদের তৈরি করা অ্যাসাইনমেন্ট প্রদর্শনী এবং আকর্ষণীয় পুরস্কার। এর মাধ্যমে যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় এবং নতুন বাংলাদেশের জন্য একঝাঁক দক্ষ ও নৈতিক কারিগর গড়ে তোলা যায়।
ইনাম বিন সিদ্দিকের কাজের পরিধি শুধু এআই তালিমেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর সৃজনশীলতার এক বড় অংশজুড়ে আছে ‘কাতিব মিডিয়া’ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘কাতিব টিভি’। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তিনি সুস্থধারার বিনোদন এবং তথ্যপ্রযুক্তিকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন। অবাক করা বিষয় হলো, প্রযুক্তির এই ব্যস্ততার মাঝেও তিনি শিকড়কে ভোলেননি। তাঁর হৃদয়ের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে দ্বীনি শিক্ষা ও সেবার নেশা। হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও তিনি একটি কওমি মাদ্রাসায় সম্পূর্ণ বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। প্রযুক্তির এই জাদুকর যখন মাদ্রাসায় ক্লাসে বসেন, তখন আধুনিকতা আর ঐতিহ্য একই সমান্তরালে যেন চলে।
পারিবারিক ঐতিহ্যে ইনাম বিন সিদ্দিক চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। তাঁর বাবা ছিলেন বরেণ্য আলেম ও উস্তাদুল কুররা হিসেবে পরিচিত মাওলানা আলী আকবর সিদ্দিক (রহ.)। পিতার সারা জীবনের সাধনা ছিল কোরআন ও নৈতিকতার প্রসার। তিনি হেঁটে, গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে মানুষের অন্তরে দ্বীনের আলো জ্বালিয়েছেন। পিতার সেই একই লক্ষ্য আজ ছেলের কাঁধে, তবে মাধ্যমটি বদলে গেছে। বাবা যা করেছেন হেঁটে হেঁটে, ছেলে আজ তা-ই করছেন প্রযুক্তির ডানায় চড়ে। পিতার সেই নৈতিকতার মশাল আজ ইনামের হাতে ‘ডিজিটাল মশাল’ হয়ে হাজারো তরুণের অন্ধকার দূর করছে।








