কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা কার্যত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় অনেক জায়গা থেকে পানি নেমেও গেছে। তবে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড, সোয়ারিঘাট, ইমামগঞ্জ ও চকবাজার এলাকার মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হয় না। বৃষ্টি থামার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সড়কে জমে থাকে হাঁটুপানি, কোথাও কাদা, কোথাও ভাঙা রাস্তা। এতে প্রতিদিনের মতোই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ী, ক্রেতা, শ্রমিক, পথচারী ও যাত্রীদের।

সরেজমিনে এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের অন্যতম শেষ গন্তব্য বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোই জলাবদ্ধতার কবলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর এত কাছে অবস্থান করেও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই পানি আটকে যায়। পানি নামতে সময় লাগে দীর্ঘক্ষণ।

মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন বেরিবাঁধ সড়ক থেকে শুরু করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকাংশ সড়কে হাঁটুপানি জমে থাকতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও দোকানের সামনে বাঁশ ও ইট ফেলে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে ড্রেনের মুখ খুলে বা পাইপ বসিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন

‘নিউমার্কেটের সামনে জলাবদ্ধতা যেন আমাদের নিয়তি’

শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, সোয়ারিঘাট থেকে লালবাগ-চকবাজার পর্যন্ত সড়কের বড় অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কাদাপানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ময়লার স্তূপ। স্থানীয়দের কেউ কেউ রাস্তার পাশেই ময়লা ফেলছেন, ফলে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।

এই পুরো এলাকা পুরান ঢাকার অন্যতম বৃহৎ পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র। কুরিয়ার সার্ভিস, ওষুধ, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক, হার্ডওয়্যার, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও শত শত পণ্যবাহী যান চলাচল করে। কিন্তু জলাবদ্ধতা ও ভাঙা সড়কের কারণে ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

jagonews24জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট কাদাপানিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় পথচারীদের/ছবি: জাগো নিউজ

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে মিটফোর্ড এলাকার ফল ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই দোকানের সামনে পানি জমে যায়। ক্রেতারা সহজে আসতে চান না। মালামাল নামানো-তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।’

স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী মো. শাহীন মিয়া বলেন, ‘এখানে পানি জমে থাকা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর একই সমস্যা চলছে। বৃষ্টি শেষ হওয়ার অনেক পরও পানি নামে না। ব্যবসা করতে গিয়ে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্পে জলাবদ্ধতা, নেপথ্যে কী?

একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী আব্দুল কাদের জাগো নিউজকে বলেন, ‘পণ্য নিয়ে হাঁটতেই সমস্যা হয়। অনেক সময় কার্টন ভিজে যায়। গাড়ি ঢুকতে পারে না, আবার বের হতেও দীর্ঘ সময় লাগে। এতে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’

রিকশাচালক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘কাদা আর গর্তের কারণে রিকশা চালাতে খুব কষ্ট হয়। যাত্রীরাও এই পথে আসতে চান না। একেকটা ট্রিপে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ লেগে যায়।’

সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারাই কোদাল দিয়ে ড্রেনের মুখ পরিষ্কার করছেন। কেউ কেউ বাঁশ দিয়ে আটকে থাকা আবর্জনা সরিয়ে পানি নামানোর চেষ্টা করছেন। তবে এসব উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

যা দেখা গেলো চকবাজারে

চকবাজারের ইমামগঞ্জ থেকে মিটফোর্ড রোড পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে কাদা-পানির কারণে হাঁটা দায়। এর মধ্যেই ক্রেতা-বিক্রেতারা মালামাল নিয়ে চলাচল করছেন। সড়কের একপাশে পণ্য ওঠানামা, অন্যপাশে যানজট। সবমিলিয়ে পুরো এলাকায় স্থবির অবস্থা।

jagonews24স্থানীয়দের কেউ কেউ রাস্তার পাশেই ময়লা ফেলছেন, ফলে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে/ছবি: জাগো নিউজ

অফিস শেষে চকবাজারে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। সেখানে তার সঙ্গে কথা হয়। রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘চকবাজারে একটি কাজ শেষ করে মিটফোর্ডে ওষুধ কিনতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এক কিলোমিটারেরও কম পথ রিকশায় যেতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। রাস্তার এই অবস্থা সত্যিই ভোগান্তির।’

আরও পড়ুন

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় ঢাকায় দিনে ক্ষতি শত কোটি টাকা

মুন্সিগঞ্জ থেকে মালামাল কিনতে আসা মো. আরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষা এলেই এই এলাকায় আসতে ভয় লাগে। কাদাপানির কারণে কাপড় নষ্ট হয়, আবার যানজটেও অনেক সময় নষ্ট হয়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ এই পথে আসতে চান না।’

স্থানীয় বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, ‘শিশু ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান। পানি জমে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়ায়। মশার উপদ্রবও বাড়ে। দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।’

স্থানীয়রা বলছেন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকর ও সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকায় প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বর্ষাকালে সাময়িক পানি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ড্রেনেজ পরিকল্পনা, সড়ক সংস্কার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পুরান ঢাকার এই দুর্ভোগ আগামী দিনেও একইভাবে চলতে থাকবে। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, খোঁড়াখুঁড়ির কাজ দ্রুত শেষ করা এবং সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

jagonews24ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও সমস্যায় পড়তে হয়/ছবি: জাগো নিউজ

এলাকাগুলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন ওয়ার্ডের আওতাভুক্ত। এসব এলাকার ভোগান্তির বিষয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসব এলাকার সড়কগুলোতে নিয়মিত চলাচল করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাইসুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক, চিকিৎসাসেবা ও ঐতিহ্যবাহী এলাকা মিটফোর্ড-সোয়ারিঘাট-চকবাজার সড়ক দীর্ঘদিন ধরে কাদাপানি, ভাঙাচোরা রাস্তা ও অকার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে চরম জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার পথচারী, রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও যানবাহনচালককে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

আরও পড়ুন

খাল-নদীর পথ হারিয়েছে বৃষ্টির পানি, বারবার ডুবছে ঢাকা

তিনি বলেন, ‘এই সড়ক দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ ওষুধের পাইকারি বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রে যাতায়াত করা হয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা অব্যাহত থাকলেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান নয়। এতে শুধু জনভোগান্তিই বাড়ছে না, বরং ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি, যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, রোগী পরিবহনে বিলম্ব এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে।’

রাইসুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এ অবস্থার জন্য অপরিকল্পিত উন্নয়নকাজ, সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ি, নিম্নমানের সড়ক নির্মাণ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি দায়ী। তাই সমস্যার সাময়িক নয়, স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, টেকসই মানসম্পন্ন সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, উন্নয়নকাজ শেষে দ্রুত রাস্তা পুনর্বাসন এবং দায়িত্বশীল তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।’

jagonews24টেকসই ও মানসম্পন্ন সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং দায়িত্বশীল তদারকি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা/ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, ‘রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে এই সড়কের দুরবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নাগরিকদের নিরাপদ চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি এবং একটি কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।’

আরও পড়ুন

২৪ ঘণ্টা পরও পানির নিচে ‘অভিশপ্ত’ নিউমার্কেটের সড়ক

কেন বৃষ্টিতে ঢাকা ডুবে যায়, তা জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা পারবো না। এখন যেটা হলো, বৃষ্টির পানির ব্যাপারে আমরা বহুবার বলেছি, ঢাকা শহরের খাল-বিলগুলো নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই ওপেন নিষ্কাশনের পানি অপসারণে সময় লাগে।’

তিনি বলেন, ‘এখন বৃষ্টির পানি যেসব স্থানে জমে, সেগুলো দ্রুত অপসারণে আমরা চেষ্টা করছি। তবে পানি নদীতে নামার পথ কম। সেগুলো আমি বাড়াতে চেষ্টা করছি। এটা আমি করপোরেশনে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বলেছি। এ বছর কতটা সুযোগ দিতে পারবো জানি না। তবে আগামী বছর হয়তো অনেকটা সুযোগ আসবে।’

এমডিএএ/ইএ