ফুটবলে খেলোয়াড়দের প্রতিভা এবং কোচদের কৌশলই এখনো সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে বেশ কিছু বছর ধরেই মাঠের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে মাঠের বাইরের প্রস্তুতির ওপর। আর প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নজিরবিহীন ব্যবহারে চিহ্নিত এবারের বিশ্বকাপে এই বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও স্পষ্ট।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কিছু অংশ ইতোমধ্যেই দর্শকদের চোখে পড়েছে। উত্তর আমেরিকার তীব্র গরমে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপের শুরুতেই অনেক খেলোয়াড়কে ‘আইস ভেস্ট’ পরতে দেখা যায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে এই ভেস্টের প্রযুক্তি বেশ জটিল। এর ভেতরে আগে থেকেই জমিয়ে রাখা বিশেষ জেল থাকে, যা ব্যবহারের সময় খেলোয়াড়দের বুক, পেট ও পিঠের মতো অংশে শীতলতা ছড়িয়ে দেয়।
এর সঙ্গে থাকে একটি বিশেষ ইনসুলেটেড জ্যাকেট, যা ঠান্ডা বাতাস ধরে রাখে। এই সমন্বিত প্রযুক্তি শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ত্বকের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
এই ভেস্টগুলোর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস একই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে এমন এক ধরনের বুটও তৈরি করেছে, যা পায়ের অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া ও ফুলে যাওয়া রোধ করতে ক্লিট-যুক্ত জুতোর ওপর পরা যায়।
ক্রীড়া ফিজিওথেরাপিস্ট মিরিয়ান মোটা বলেন, ‘এই ধরনের প্রযুক্তি দ্রুত পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। শরীর কৃত্রিমভাবে ঠান্ডা হয়ে গেলে হৃদ্যন্ত্রকে ত্বকের দিকে অতিরিক্ত রক্ত পাম্প করতে হয় না। ফলে সক্রিয় পেশিগুলোতে রক্তপ্রবাহ ভালোভাবে বজায় থাকে।’
এবারের বিশ্বকাপে স্পেন ও আর্জেন্টিনাসহ এক ডজনের বেশি দল কুলিং ভেস্ট ব্যবহার করছে। তবে পারফরম্যান্স বাড়ানোর প্রযুক্তি এখানেই শেষ নয়।
কানাডা দল ব্যবহার করছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) চশমা, যা খেলোয়াড়দের মস্তিষ্ককে দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়। নিয়মিত অনুশীলনে খেলোয়াড়দের বিভিন্ন ধরনের নড়াচড়া, আকার ও রঙের ধরন শনাক্ত করতে হয়। এতে খেলোয়াড়দের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, মোটর সমন্বয় এবং পার্শ্বদৃষ্টি উন্নত হয়, যার প্রভাব পড়ে মাঠে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়রা ব্যবহার করছেন নাইকির বিশেষ ফুটবল বুট, যা খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ কমিয়ে মনোযোগ বাড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটির দাবি, স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণার ভিত্তিতে প্রায় এক দশক ধরে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন করা হয়েছে।
এআইয়ের ব্যবহার শুধু খেলোয়াড়দের প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; ম্যাচ পরিচালনাতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে লেনোভো খেলোয়াড়দের এমন ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) অবতার প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইডের মতো সিদ্ধান্ত নিতে রেফারিদের সহায়তা করছে।
এজেন্সিয়া এন্ড টু এন্ডের প্রযুক্তি পরিচালক রেনান বোর্গেস বলেন, ‘আগের সংস্করণে সাধারণ মানবদেহের মডেল ব্যবহার করা হতো। এখন প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীর আগেই স্ক্যান করা হয় এবং তার সঠিক গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে মিলিমিটার ব্যবধানের সিদ্ধান্তেও ভুল প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সময়ও অনেক কম লাগছে।’
অ্যাডিডাস ও কিনেক্সনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ট্রিওন্ডা’ এবার রেফারিদের বড় সহায়ক।
দর্শকদের জন্য বাজারে বিক্রি হওয়া বলের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, টুর্নামেন্টে ব্যবহৃত সংস্করণে একটি মোশন সেন্সর রয়েছে, যা রিয়েল-টাইমে বলের গতিবিধির তথ্য ভিএআর দলের কাছে পাঠায়।
যদিও এই প্রযুক্তি আগের আসরেও ছিল, এবার এর গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন হয়েছে। আগে সেন্সরটি বলের ঠিক কেন্দ্রে বসানো থাকলেও এখন সেটি বলের বাইরের প্যানেলের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, ফলে তথ্য আরও নির্ভুলভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
এবারের সবচেয়ে বড় নতুন সংযোজন হলো ফুটবল এআই প্রো, যা লেনোভো তৈরি করেছে এবং ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দলকে সরবরাহ করেছে। এই প্ল্যাটফর্ম ম্যাচের হাজার হাজার তথ্য বিশ্লেষণ করে কোচিং স্টাফকে কৌশলগত প্রতিবেদন এবং ম্যাচ পরিকল্পনার সুপারিশ দেয়।
ফিফার মতে, এই প্রযুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো শক্তিশালী ও তুলনামূলক দুর্বল ফুটবল জাতিগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ব্যবধান কমানো, যাতে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকে। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়নেও এবার এআই ব্যবহার করছে ফিফা।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্ত সেরা একাদশ নির্বাচন হতো বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে। এবার সেই জায়গা নিয়েছে পাওয়ার র্যাঙ্কিং। এই প্রযুক্তি ম্যাচ চলাকালীন সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের আক্রমণ, সৃজনশীলতা ও রক্ষণ, এই তিন বিভাগে মূল্যায়ন করে। গোলরক্ষকদের মূল্যায়ন করা হয় তাদের সেভ এবং পায়ে বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতার ভিত্তিতে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত আক্রমণ বিভাগে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে এগিয়ে ছিলেন জার্মান ফরোয়ার্ড ডেনিজ উনদাভ। সৃজনশীলতায় শীর্ষে ছিলেন ফ্রান্সের মাইকেল ওলিসে এবং রক্ষণে সর্বোচ্চ রেটিং পেয়েছিলেন কানাডার ডিফেন্ডার ডেরেক কর্নেলিয়াস।
ফিফার প্ল্যাটফর্মের বাইরে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল গুগলের এআই প্ল্যাটফর্ম জেমিনির সহযোগিতাও নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনুশীলনের সময় দলের ট্রেনিং পোশাকে জেমিনির লোগো দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই এআই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে কোচিং স্টাফকে সহায়তা করছে। প্রযুক্তিবিদ রেনান বোর্গেসের মতে, ফুটবল ও প্রযুক্তির এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে।
তার ভাষায়, ‘প্রযুক্তি নির্ভুলতা বাড়ানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, কিন্তু প্রতিভা তৈরি করতে পারে না। সৃজনশীলতা, মুহূর্তের উদ্ভাবন কিংবা ভুল-এসব এখনো পুরোপুরি মানুষের বিষয়, আর অনেক সময় ম্যাচের ফলও এগুলোই নির্ধারণ করে।’
আরএএইচইউএল/আইএন








