বোস্টন স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সের কাচের ওপারে বসে আছেন তিনি। ফ্লাডলাইটের আলো এসে পড়েছে চশমায়। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা আলতো হাসিতে কিছুটা উদাসীনতা, কিছুটা যেন ফেলে আসা যৌবনের দীর্ঘশ্বাস।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর এই প্রথম ফ্রান্সের কোনো ম্যাচ গ্যালারিতে বসে দেখলেন আঁতোয়ান গ্রিজমান। ৩৫ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড এখন খেলেন অরল্যান্ডো সিটিতে। তাঁর সামনেই মরক্কোর রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে ফ্রান্স পৌঁছে গেল টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।

অথচ তিন বছর আগে ফরাসি সাম্রাজ্যের রাজদণ্ডটা তাঁরই হাতে ওঠার কথা ছিল। উগো লরিস যখন বিদায় নিলেন, ফ্রান্সের এক যুগের অভ্যাস ভেঙে গেল। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নির্ভরতার মুখ সরে গেল। অধিনায়কের আর্ম ব্যান্ডের জন্য নতুন একটা হাত দরকার হলো। স্বাভাবিক নিয়মে এরপর আসার কথা আঁতোয়ান গ্রিজমানের নাম। দিদিয়ের দেশমের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অস্ত্র।

কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ২৪ বছরের এক ছেলের হাতে তুলে দেওয়া হলো ফ্রান্সের অধিনায়কত্ব—কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিতর্ক হলো। দলে অভিমান ছিল, ছিল অস্বস্তিও। গ্রিজমানই পরে বলেছিলেন, সিদ্ধান্তটা গিলতে তাঁর কষ্ট হয়েছিল। কারণ, নেতৃত্ব তো একটা স্বীকৃতিও।

সেই বিতর্ক যদি এত দিন পর্যন্ত একটু-আধটু থেকেও থাকে, বোস্টনের বাতাসে কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে তা। মরক্কোকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার রাতে ফরাসিদের প্রথম গোলটি আসে এমবাপ্পের পা থেকে। এই বিশ্বকাপে তাঁর অষ্টম গোল। এখন পর্যন্ত তিনি মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে। টানা দুটি বিশ্বকাপে ৮ গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও তিনি।

এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পের শরীরী ভাষায় ‘সিনিয়র’ সুলভ গাম্ভীর্যটা নজরে পড়ার মতো। ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড যেন কেবল বলই তাড়া করছেন না, ফরাসি ফুটবলের বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে এক সুতোয় বাঁধছেন।

এবারের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের আগপর্যন্ত ৮ গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে

এনগোলো কান্তে কিংবা লুকাস এরনান্দেজের মতো পুরোনো বিশ্বজয়ীরা চোটের কারণে এবার দলে নেই। ২০১৮ সালের সেই চপল, হরিণের মতো ছুটে চলা বিশ্বকাপজয়ী দলটার মধ্যে এই স্কোয়াডে আছেন কেবল দুজন—উসমান দেম্বেলে আর এমবাপ্পে নিজে। ফলে এমবাপ্পে এখন আর শুধু গোলশিকারি নন। তিনি তরুণ দলটার মেন্টর, পথপ্রদর্শক।

কারও কারও চোখে ফ্রান্সের এই দলটা আগের দুই বিশ্বকাপের দলের চেয়েও ভয়ংকর। কিন্তু এমবাপ্পে নিজেই এই দলকে সেরা বলতে চান না। বোস্টনে সেদিন স্টেডিয়াম ছেড়ে যাওয়ার আগে মিক্সড জোনে বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, আবার রানার্সআপ হওয়ার স্বাদও পেয়েছি। এই দলটা কিন্তু ওই দুটোর কোনোটির মতোই নয়। হয়তো এটা আমার খেলা সেরা ফরাসি দল নয়, তবে এই দলটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।’

এমবাপ্পের সামনে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠার হাতছানি

এমবাপ্পে অবশ্য জানেন, সম্ভাবনা আর অর্জনের মাঝখানে কতটা ফাঁক থাকতে পারে। ইউরো ২০২০-এর সেই ফরাসি দলটার কথা মনে আছে? এমবাপ্পে, গ্রিজমান, বেনজেমা—যাঁদের বলা হয়েছিল ‘বিশ্বের ঈর্ষা’!

শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল সেই দল। সেই স্মৃতি এমবাপ্পেকে সতর্ক করেছে। তিনি এ–ও জানেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ কখনো কখনো নিজের ভেতরেই থাকে। তাই শুধু বলেছেন, ‘আমরা আমাদের ক্ষমতা জানি, কিন্তু শুধু ক্ষমতা দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। মাঠে নামার সময় আত্মবিশ্বাস থাকে ঠিকই, তবে নিজেদের অজেয় দাবি করার আগে আমাদের প্রমাণ করতে হবে।’

বড় খেলোয়াড়েরা নেতা হলে তাঁদের অহংকার দলের জন্য বর্ম হয়ে ওঠে। এমবাপ্পে এখন ফরাসি দলের সেই বর্ম। হয়তো তিনি এখনো ফ্রান্সের ইতিহাসে সেরা অধিনায়ক নন, কিন্তু তিনি এমন একটা দলের অধিনায়ক, যাদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখা যায়। ফুটবলে শেষ পর্যন্ত স্বপ্নটাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

বিশ্বকাপের সেরা ত্রয়ীদের তালিকায় কোথায় থাকবেন এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে?