মহানবী (সা.) কখনো কারও সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতেন না, এমনকি কোনো অমুসলিমের সঙ্গেও না এবং সাহাবিদেরও এ ব্যাপারে সচেতন করেছেন। 

আসমা (রা.) বলেন, নবীজির যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি তখন নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব কি না? তিনি বললেন, “হ্যাঁ”।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭৮)

জায়েদ নামের এক ইয়াহুদি পণ্ডিত ছিলেন। প্রচুর সম্পদ ছিল তাঁর। একপর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবীজির সঙ্গে অনেক যুদ্ধেও অংশ নেন। 

তিনি নিজেই তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমবার যখন নবীজিকে দেখি, তখনই তাঁর নবুয়তের সমূহ নিদর্শন আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।

তবে শুধু দুটি নিদর্শন আমি বুঝতে পারিনি। একটি হলো তাঁর ধৈর্য সব সময় রাগের ওপর বিজয়ী থাকবে। অপরটি হলো, মূর্খ লোকদের কঠোরতা সত্ত্বেও তাঁর ধৈর্য অটুট থাকবে।’

নবীজির সঙ্গে যেভাবে ওমরের কন্যার বিয়ে হয়

জায়েদ বলেন, ‘আমার ইচ্ছা জাগল কোনোভাবে নবীজির সঙ্গে এমন কোনো কাজ করব, যাতে অপর দুটি নিদর্শনও আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়।’

একদিন নবীজি (সা.) ঘর থেকে হজরত আলীর সঙ্গে বের হন। তখন গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি বাহনে চড়ে তাঁর কাছে এসে বলল, ‘আল্লাহর রাসুল, অমুক মহল্লার সবাই মুসলমান, তারা বেশ ক্ষুধার্ত। ভালো মনে করলে তাদের কাছে কিছু পাঠিয়ে দিন।’

নবীজি বললেন, ‘আমি অবশ্যই পাঠাতাম; কিন্তু এখন আমার কাছে কিছুই নেই।’

জায়েদ বলেন, ‘এটা শুনে আমি নবীজির কাছে গিয়ে বললাম, “মুহাম্মদ, আপনি চাইলে আমার থেকে এখন কিছু অর্থ নিয়ে নিন এবং দুই মাস পরপর বিনিময়ে খেজুর দিয়ে দেবেন।”

নবীজি বললেন, “ঠিক আছে, দিয়ে দাও।”

তখন আমি তাঁকে ৮০ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) দিই। দুই মাস পূরণ হতে তখনো দুই দিন বাকি। এর আগেই আমি নবীজির কাছে গিয়ে হাজির। তিনি তখন একটা জানাজার উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন মাত্র। তাঁর সঙ্গে আবু বকর, ওমর, ওসমান (রা.) ছাড়াও অনেক সাহাবি ছিলেন।

সাহাবি খুজায়মার একটি সাক্ষ্যের মূল্য

আমি আগপিছ না ভেবে সবার সামনে তাঁর চাদর টেনে ধরে ক্ষোভ মিশিয়ে বললাম, “মুহাম্মদ, আমার পাওনা আদায় করো। আল্লাহর কসম, তোমরা কোরাইশের লোকেরা পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করো।” এ রকম আরও কিছু কটু কথা বললাম।’

জায়েদ আরও বলেন, ‘আমার দৃষ্টি যখন ওমরের দিকে পড়ে, দেখি তিনি রাগে কটমট করছেন। ওমর (রা.) তখন আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, “হে আল্লাহর দুশমন, তুমি কি নবীজির সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছ, যা আমি শুনতে পাচ্ছি? আল্লাহর কসম, আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব।”

ওমরের কথা শুনে নবীজি (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন, “ওমর, এভাবে নয়; বরং তাকে ভদ্রভাবে তাগাদা করার আর আমাকে কর্জ পরিশোধ কথা বলো।” তিনি আরও বলেন, “ওমর, তুমি তার সঙ্গে গিয়ে তার প্রাপ্য পরিশোধ করে দাও এবং বাড়তি আরও ২০ সের সঙ্গে দিয়ো। কেননা তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছ।”’

জায়েদ বলেন, ‘নবীজির কথামতো আমি ওমরের সঙ্গে যাই। তিনি আমার প্রাপ্য পরিশোধ করলেন এবং সঙ্গে ২০ সের বাড়তি দিলেন।

আমি তাঁকে বললাম, “ওমর, আপনি কি জানেন, আমি এমনটি কেন করেছি? এর আগে নবীজির সব আলামত আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শুধু এই আলামত সম্পর্কে জানা বাকি ছিল। তা-ও এখন দেখে নিলাম। আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি নবীজির প্রতি ইমান আনলাম।”’

এরপর জায়েদ নিজেই নবীজির সমীপে উপস্থিত হয়ে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান। (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ২৮৮৯)

প্রকৃতপক্ষে নবীজির এই মহান চারিত্রিক সৌন্দর্যই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় মোজেজা এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দাওয়াতের ভাষা, যা শত্রুকেও বন্ধুতে এবং অবিশ্বাসীকেও বিশ্বাসীতে রূপান্তর করতে পারত।

কে নবীজির সবচেয়ে প্রিয়