‘সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আমরা এক টাকাও ছুঁইনি। টাকা দিয়ে কী করবো? সারা দুনিয়া এনে দিলেও কি আমার মেয়ে ফিরে আসবে? আমি তো বলেছি, উল্টো টাকা দেব, মেয়েকে এক সেকেন্ডের জন্য আমার বুকে এনে দাও, জড়িয়ে ধরি।’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার। ৩৬ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া বিভীষিকাময় সেই ঘটনার এক বছর উপলক্ষে রোববার (১৯ জুলাই) মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণ নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনাস্থল/ফাইল ছবি
আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমরা কিচ্ছু চাই না। সরকারের কাছে আর কোনো চাওয়াও নেই, শুধু একটাই দাবি- স্কুলটা ওখান থেকে সরিয়ে ফেলা হোক। এখনো এ স্কুলের ওপর দিয়ে বিমান যায়। রানওয়ে আগে হয়েছে, স্কুল পরে। এটা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। আমার আয়মান তো চলে গেছে, কিন্তু ওর মতো শত শত আয়মান এখনো ওই স্কুলে পড়ে। আমি চাই না আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি হোক।’
দুর্ঘটনার সময় তাসনিম আফরোজ আয়মান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বয়স ছিল ১০ বছর। দুর্ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২৫ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওপারে পাড়ি জমায় শিশু আয়মান।
আয়মানের মা আয়েশা আক্তার হাসপাতালে নেওয়ার পর দগ্ধ মেয়ের কাটানো চারদিনের দুঃসহ সময়ের স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েটা সাহসী ও শান্ত ছিল। হাসপাতালে গেলাম, দেখি ওর গলা থেকে সারা শরীর পোড়া। সেই পোড়া শরীর নিয়ে বাচ্চাটা আমাকে বলেছিল, ‘আম্মু, আমার কিচ্ছু হয় নাই, তুমি কিন্তু কাঁদবা না। আর বাবা যেন না কাঁদে।”
আরও পড়ুন
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর, এখনো তাড়া করে ভয়ংকর স্মৃতি
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির বছরপূর্তিতে দোয়া-স্মরণসভা
‘ওর ছোট বোন দুইটাকে কোথায় রেখে এসেছি, সেই খোঁজ নিচ্ছিল। ওর সঙ্গে ওর বান্ধবী ছিল, তার খোঁজ নিতে বললো, তার এক শিক্ষকও আহত হয়েছেন, তারা কেমন আছে জানতে চাইলো। চারদিন কষ্ট করে ২৫ তারিখ শুক্রবার ভোরে আয়মান মারা যায়’ যোগ করেন আয়েশা।
দুঃসহ স্মৃতি বয়ে চলেছে আয়মানের পরিবার। অসহনীয় এ দুঃখ ভুলতে বাসা পরিবর্তন করেছেন তারা। তবুও কী ভোলা যায়? আয়মানের মা বলেন, ‘আজকে এক বছর হয়ে গেছে। আমরা উত্তরার ওই বাসায় আর কোনোদিন পা রাখিনি। বাসাটা তালা মেরে রেখে চলে আসছি। ওর বাবা আজ পর্যন্ত ওই বাসার গলিতেই ঢোকেনি।’
‘আয়মানের সব স্মৃতি...ওর খেলার ক্লে, পানির বোতল, খাতা সব ওই বাসারই টেবিলে আগের মতোই পড়ে আছে। সকালে যে ড্রেসটা পরে মেয়েটা স্কুলে গিয়েছিল, ওর গেঞ্জি আর প্যান্টটা এখনো ওই ঘরেই ঝুলানো আছে। সেদিকে তাকাতেই পারি না’ বলে যান মা আয়েশা।
সন্তানের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়া এক মাকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে/ফাইল ছবি
যা ঘটেছিল সেদিন
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, দিনটি ছিল সোমবার। দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে।
দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট শিশুদের কোমল শরীর। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই শিশু। সেদিন প্রাণ হারান পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।
এএএইচ/একিউএফ








