একসময় গ্রামের এক সংগ্রামী তরুণ হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) ভর্তি হয়েছিলেন ডা. আবু সালেহ মো. অলিউল্লাহ। কয়েক দশক পর সেই একই ক্যাম্পাসে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ছেন তার মেয়ে সিগমা ওয়ালিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ডিএমসি ডে’তে একই ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে যেন দুই প্রজন্মের স্মৃতি, আবেগ আর স্বপ্ন এক সুতোয় গাঁথা হলো।

দেশের চিকিৎসা শিক্ষার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ ৮০ বছর পূর্ণ করে ৮১তম বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যখন ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবের আমেজ, তখন সবচেয়ে আবেগঘন গল্পগুলোর একটি হয়ে উঠেছে একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বাবা ও মেয়ের এই পথচলা।

আরও পড়ুন

সার্বক্ষণিক নির্ভরতার জায়গা হলো ঢাকা মেডিকেল: প্রধানমন্ত্রী

বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৩৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. আবু সালেহ মো. অলিউল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম একই মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া অবশ্যই বিশেষ অনুভূতির বিষয়। বাংলাদেশে এমন ঘটনা একেবারে বিরল না হলেও, নিজের সন্তানের একই প্রতিষ্ঠানে পড়ার অভিজ্ঞতা আলাদা আনন্দ দেয়।

নিজের ছাত্রজীবনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমি গ্রাম থেকে উঠে এসেছি। বাবা মারা যাওয়ার পর খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বড় হয়েছি। সেই অবস্থা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। সাধারণ জীবন থেকে দেশের সেরা মেডিকেল কলেজে এসে চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ পেয়েছি—এ জন্য আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।

তার ভাষায়, ঢাকা মেডিকেল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।

আরও পড়ুন

ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকবর্তিকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছর

অন্যদিকে ৭১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মেয়ে সিগমা ওয়ালিনের কাছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের সব মেডিকেল কলেজের ‘মাদার ইনস্টিটিউট’। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এই প্রতিষ্ঠান দেশের চিকিৎসা শিক্ষার নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতেও যেন সেই গৌরব ধরে রাখতে পারে, আরও ভালো করে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে বাবার সঙ্গে ক্যাম্পাসে হাঁটার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ডিএমসি ডে’তে আমরা একসঙ্গে ক্যাম্পাসে হাঁটছিলাম। বাবা যেমন তার পরিচিত অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করছিলেন, তেমনি আমারও সহপাঠী ও পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হচ্ছিল। দুই প্রজন্মের পরিচিত মানুষদের একই ক্যাম্পাসে একসঙ্গে দেখতে পারাটা সত্যিই অন্যরকম আনন্দের ছিল।

শুধু আবেগ নয়, ঢাকা মেডিকেলে পড়াশোনার সঙ্গে একটি নৈতিক দায়িত্বও জড়িয়ে আছে বলে মনে করেন সিগমা। তিনি বলেন, ওরিয়েন্টেশনের দিন কিংবদন্তি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদের অবসরের দিন ছিল। সেদিন তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, এই সাদা অ্যাপ্রনে কখনো তোমরা দাগ লাগতে দিও না।

আরও পড়ুন

ঢামেককে বিশ্বমানের করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৪ দফা স্মারকলিপি

সিগমা বলেন, এই কথাটি আমরা সবসময় মনে রাখার চেষ্টা করি। চিকিৎসক হিসেবে কখনো যেন কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ি, সেই চেষ্টা থাকবে সবসময়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ যেভাবে সবসময় দেশের সেরা শিক্ষার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, ভবিষ্যতেও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখুক। আর শতবর্ষ পূর্তির দিনও যেন একই গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান।

১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ আজ শুধু দেশের সবচেয়ে পুরোনো চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নয়; ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী। আট দশকের এই পথচলায় অসংখ্য চিকিৎসক তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ একই ক্যাম্পাসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুই প্রজন্ম—একজনের স্মৃতিতে সংগ্রাম, অন্যজনের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাদের গল্প যেন ঢাকা মেডিকেল কলেজেরই ৮০ বছরের উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে। 

এমডিএএ/এমএমকে