ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল আর উজান থেকে নেমে আসা পানিতে থই থই করছে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগরের অনেক এলাকা এখন পানির নিচে। কোথাও কোমর, কোথাও গলাসমান পানি। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। বন্যা ও পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।

jagonews24

বন্যার পানিতে ধসে পড়েছে মাটির ঘর, ছবি: জাগো নিউজ

জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম মহানগরে দুইজন, বাঁশখালীতে তিনজন, সীতাকুণ্ডে একজন, আনোয়ারায় একজন, রাউজানে একজন, রাঙ্গুনিয়ায় একজন, হাটহাজারীতে একজন এবং সাতকানিয়ায় একজন মারা গেছেন। পানিতে ডুবে, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তারা।

আরও পড়ুন

বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম / পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায়। পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে সাঙ্গু, ডলু, শঙ্খসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এতে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের চাল পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় মানুষ ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে যেতে না পেরে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বাঁশখালীতে শত শত মাটির ঘর ধসে পড়েছে। সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘরবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চন্দনাইশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আনোয়ারা, বোয়ালখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকাও জলাবদ্ধ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

jagonews24

বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে আধা-পাকা সড়ক, ছবি: জাগো নিউজ

দুর্গত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ পরিবারের ঘরে রান্না করার মতো পরিবেশ নেই। রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। অনেক পরিবার শিশুদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শিশুদের ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে টানা বর্ষণ / উচ্চ ভূমিধসের ঝুঁকি, ২২১ পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিলো সেনাবাহিনী

বৈলছড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মু. সাকিবুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘পানি এত দ্রুত বেড়েছে যে কিছুই সরিয়ে নিতে পারিনি। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে এখনও পানি। খাবার ও বিশুদ্ধ পানি নেই। আমরা দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সহায়তা চাই।’

পুকুরিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, বন্যার পানি এখনও না নামায় ইউনিয়নের প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ পানিবন্দি। অনেক পরিবার নিজ বাড়িতেই আটকা পড়ে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, রান্নাঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার রান্না করতে পারছে না। ফলে কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন, আবার অনেকের ঘরে খাবারও নেই। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন।

বন্যার পানিতে হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, সবজি খেত ও অন্যান্য ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে মাছের ঘের, পুকুরের মাছ, হাঁস-মুরগি এবং গবাদিপশুর খাদ্যসামগ্রী। অসংখ্য কাঁচা ও আধাপাকা বসতঘর ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও ছোট ছোট সেতু। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক এলাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দুর্গত মানুষের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

jagonews24

পানি ঢুকে পড়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, ছবি: জাগো নিউজ

সাতকানিয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষ এখনও পানিবন্দি থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে বন্যার পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

পাহাড়ি ঢল-বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কক্সবাজার

তিনি বলেন, যেসব এলাকায় এখনও পানি রয়েছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোট ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ এবং পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার, রান্না করা খাবার, চাল, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, ওরাল স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, চট্টগ্রাম জেলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ লাখ টাকা বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বিতরণ করা হবে।

jagonews24

থানায় প্রবেশের রাস্তাও পানির নিচে, ছবি: জাগো নিউজ

এ ছাড়া জেলার জন্য ৭০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ মেট্রিক টন চাল দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩০০ মেট্রিক টন চাল শনিবার বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফ জাহান সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, বন্যার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনও প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি। দুর্গত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু রাখা হয়েছে।

jagonews24

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে রাস্তাঘাট, ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।

বাঁশখালীতে স্থানীয় বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আসিফুল হক জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলার বড় একটি অংশ এখনও পানির নিচে। আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি-মৎস্যে বড় ধাক্কা, ক্ষতির মুখে হাজারো চাষি

দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে গিয়ে মানুষের চরম দুর্ভোগের চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক পরিবার নিয়মিত খাবার জোগাড় করতে পারছে না, কেউ কেউ দিনে একবেলাও খাবার পাচ্ছে না। বন্যার পানিতে বহু মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়েছে। সরেজমিনে পরিস্থিতি না দেখলে এসব মানুষের দুর্দশার প্রকৃত চিত্র উপলব্ধি করা কঠিন।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প পথে যানবাহন চলাচল করছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা বলছেন, পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, শুকনো খাবার, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং নদী-খাল সংস্কার ও টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উদ্যোগ না নিলে প্রতি বর্ষায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

এদিকে, পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে, তবে আগের তুলনায় এর তীব্রতা কম থাকতে পারে।

এমআরএএইচ/এসএনআর