টানা বৃষ্টিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার চিত্র পুরোনো। তবে এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কয়েকটি র্যাম্পের সামনের সড়ক। বিশেষত, বনানী র্যাম্পের সামনে গত দুদিন ধরে হাঁটুপানি জমে আছে। এতে ওই সড়কে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল। চরমে পৌঁছেছে জনদুর্ভোগ।
এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রাফিক পুলিশও অপ্রয়োজনে বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ওই সড়ক ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, আধুনিক প্রকৌশলে নির্মিত একটি এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের সামনে কেন এতো পানি জমে? এটি কি নির্মাণগত কোনো ত্রুটি, নাকি ঢাকার দীর্ঘদিনের ড্রেনেজ সংকটেরই একটি অবধারিত পরিণতি?
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের সামনে যে জলাবদ্ধতা তার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যাওয়া, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অতিবৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এসব জলাশয়ের পানি একসময় নিকুঞ্জ এয়ারপোর্ট হয়ে বড় জলাধারে চলে যেতো। সেই জায়গাগুলো এখন ভরাট হয়ে গেছে। এগুলো করা হয়েছে গত চার-পাঁচ বছরে। আমাদের চোখের সামনে। কিন্তু তখন কেউ কিছু বলেনি।—স্থপতি ইকবাল হাবিব
জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পগুলোর সামনে যেভাবে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, এটি র্যাম্পের কারণে নয়। আজ থেকে ছয় বছর আগে বনানীর ওই জায়গাটা যদি আমরা কল্পনা করি; যেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পটা নামলো, ওই জায়গাসহ মহাখালী থেকে সেনাবাহিনীর গলফ পর্যন্ত পুরো জায়গাজুড়ে রেললাইনের দুপাশে বড় জলাশয় ছিল।
আরও পড়ুন
খাল-নদীর পথ হারিয়েছে বৃষ্টির পানি, বারবার ডুবছে ঢাকা
‘অর্থাৎ, একটি সড়ক বানানোর সময় দুপাশ থেকে মাটি নিয়ে কিন্তু সড়কের লাইন বানানো হয়। তখন সড়কের দুপাশে জলাশয় বা খালের মতো সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বড় জলাশয়গুলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সময় এবং পরবর্তী সময়ে ভরাট করে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড প্রবেশপথ তৈরি করেছে। সেনা মালঞ্চসহ অনেকগুলো স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।’
‘এসব জলাশয়ের পানি একসময় নিকুঞ্জ এয়ারপোর্ট হয়ে বড় জলাধারে চলে যেতো। সেই জায়গাগুলো এখন ভরাট হয়ে গেছে। এগুলো করা হয়েছে গত চার-পাঁচ বছরে। আমাদের চোখের সামনে। কিন্তু তখন কেউ কিছু বলেনি’—যোগ করেন স্থপতি ইকবাল হাবিব।

এখন ব্লু নেটওয়ার্ক তৈরি ছাড়া ওইসব সড়ক কিংবা ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের আর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।
ইকবাল হাবিব বলেন, চার বছর আগে ঢাকার ২৬টি খাল সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছে ওয়াসা। এর আগে ১৬ বছর সেগুলো ওয়াসার কাছে ছিল। কিন্তু তারা কেউ ব্লু নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেনি।
একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে ৭৮টি খাল রয়েছে। এর বাইরে অসংখ্য জলাধার রয়েছে। এগুলো নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা না গেলে ভবিষ্যতে কেউ ঢাকাকে বাঁচাতে পারবে না।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের সামনে যে জলাবদ্ধতা তার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যাওয়া, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অতিবৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।— বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট হয়ে কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উড়াল সড়ক। এর বিভিন্ন অংশে ওঠানামার জন্য ৩১টি র্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। এসব র্যাম্পের বেশিরভাগই নগরীর ব্যস্ত সড়ক ও পূর্বের জলাভূমি বা নিচু এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত।
এরই মধ্যে বিমানবন্দর থেকে এফডিসি পর্যন্ত এই উড়াল সড়কে যান চলাচল করছে। এফডিসি থেকে খিলগাঁও অংশের কাজও শেষ পর্যায়ে। এই অংশে আরও বেশ কয়েকটি র্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে এফডিসি অংশে আরও বেশ কয়েকটি র্যাম্প হাতিরঝিলের ভেতর (হোটেল সোনারগাঁও অংশ) নামানোর কাজ চলছে।
আরও পড়ুন
বন্যা-পাহাড়ধসে ৫৪ মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ
এদিকে, গত দুদিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বনানী এলাকার বাসিন্দা, অফিসগামী মানুষ ও পথচারীরা। গতকাল রোববার (১২ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী র্যাম্পের সামনে প্রায় হাঁটু সমান পানি জমেছে। বৃষ্টির পানি র্যাম্প গড়িয়ে নামছে সড়কে।

এমন পরিস্থিতিতে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে যানবাহন সড়কে নামতে পারছে না। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কে নামলেই গাড়ির ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাচ্ছে। এ কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে থেকে বনানী পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের ওপর সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
কিন্তু এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প দিয়ে নিচে নেমে দেখি, প্রায় হাঁটু পানি। প্যান্ট হাঁটু পরিমাণ উঠিয়ে ফুটপাতে উঠেছি। কিন্তু কোথায় ম্যানহোল, কোথায় গর্ত—কিছুই বোঝা যায় না।—ভুক্তভোগী আলমগীর হোসেন
গাজীপুর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বনানীর উদ্দেশ্যে রওনা হন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন। বিমানবন্দর থেকে আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত আসতে চার ঘণ্টা সময় লেগেছে। একপর্যায়ে গাড়ি থেকে নেমে ছাতা মাথায় হেঁটে বনানী ১১ নম্বর রোডের একটি অফিসের দিকে রওনা দেন।
আলাপকালে আলমগীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বৃষ্টির কারণে বিমানবন্দর সড়কের অনেক জায়গায় পানি জমেছে। এক্সপ্রেসওয়েতে বেশি টাকার টোল দিয়ে উঠলাম। কিন্তু গাড়ি উপরে ওঠার পর যেন আর এগোয় না। সাত-আট কিলোমিটার জায়গা আসতে চার ঘণ্টা সময় লাগছে। পরে বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছি।
‘কিন্তু এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প দিয়ে নিচে নেমে দেখি, প্রায় হাঁটু পানি। প্যান্ট হাঁটু পরিমাণ উঠিয়ে ফুটপাতে উঠেছি। কিন্তু কোথায় ম্যানহোল, কোথায় গর্ত—কিছুই বোঝা যায় না’—বলছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পে হাঁটুপানি, যাতায়াত পরিহারের আহ্বান
গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে নিজেদের ফেসবুক পেজে একটি পোস্টে ট্রাফিক আপডেট দেয় গুলশান ট্রাফিক বিভাগ। ওই পোস্টে বলা হয়, টানা ভারী বর্ষণের ফলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী র্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেট ও মহানগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল ধীরগতির রয়েছে এবং কিছু স্থানে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কাকলী মোড়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে আসা যানবাহন এবং নিচের সড়কে চলাচলকারী যানবাহনকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হচ্ছে। তাই অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ পরিহারের আহ্বান জানায় পুলিশ।
একই ফেসবুক পেজে সোমবার বেলা ১১টার দিকে ট্রাফিক আপডেট দেওয়া হয়। আজ ওই পোস্টে বলা হয়, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন সড়কের নিচু স্থানসমূহে জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। আজকেও সকাল থেকেই বৃষ্টি ঝরছে। যার ফলে বনানী কবরস্থানের পরে ঢাকা গেট সংলগ্ন মূল সড়কের ইনকামিং এবং আউটগোয়িং উভয় দিকেই কিছুটা জলাবদ্ধতা রয়েছে। যান চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে।

সেখানে বলা আরও হয়, বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের নামার প্রান্তে হালকা পানি জমেছে। যান চলাচল কিছুটা ধীরগতিসম্পন্ন। ইসিবি এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট গার্লস স্কুলের সামনে পানি জমে রয়েছে। একইভাবে গুলশান বিভাগের কোথায় কোথায় পানি জমেছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বনানীতে এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পটি যেখানে ছিল, সেখানে পাঁচ বছর আগেও কিছুটা নিচু ছিল। বেশ কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে নার্সারি তৈরি করেছিলেন। তারও অন্তত দুই যুগ আগে বিমানবন্দর সড়ক ও রেললাইনের দুপাশে লম্বালম্বিভাবে খালের মতো ছিল। অর্থাৎ, রাস্তা ও রেল লাইন করার সময় দুপাশ থেকে যে মাটি কাটা হয়েছিল, এর ফলে খালের মতো জলাশয় তৈরি হয়।
আরও পড়ুন
মিরপুর যেন মিনি কক্সবাজার!
এসব খাল দিয়েই বনানী, গুলশান, মহাখালী, তেজগাঁও অঞ্চলের পানি নিকুঞ্জ হয়ে বিমানবন্দর এলাকার বড় জলাশয়ে চলে যেতো। এখন যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি তৈরি করা হয়েছে, তার পুরোটিই রেল লাইন ও বিমানবন্দর সড়কের ওপর দিয়ে তৈরি। ফলে সড়ক ও রেললাইনের পাশে যতে জলাশয় ছিল, সব ভরাট হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসানের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেনি।
তবে রোববার ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বনানীসহ ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি গুলশান, বনানী ও মহাখালীর রাস্তায় জমে থাকা পানির দ্রুত অপসারণসহ ভবিষ্যতে যেন পানি জমে না থাকে সেজন্য সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন।
এমএমএ/এমকেআর








