কাতার বিশ্বকাপের সেই রাতটা মরক্কো ভুলতে পারেনি। আল-বায়ত স্টেডিয়ামে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নটা ভেঙে দিয়েছিল ফ্রান্স। চার বছর পর বোস্টনে দেখা হলো আবার। প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নেমেছিল আটলাস লায়নরা। প্রথম এক ঘণ্টা পর্যন্ত সেই স্বপ্ন বেঁচেও ছিল। ইয়াসিন বুনু পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন, একের পর এক আক্রমণ সামলেছেন, ফরাসিদের হতাশ করেছেন বারবার। কিন্তু বড় ম্যাচে কখনো কখনো একটি মুহূর্তই সব বদলে দেয়। সেই মুহূর্তের নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে।

পেনাল্টি মিস করা সেই এমবাপ্পেই দ্বিতীয়ার্ধে ভেঙে দিলেন মরক্কোর প্রতিরোধ। এরপর নিজেই বানিয়ে দিলেন উসমান দেম্বেলের গোল। দুই তারকার জোড়া আঘাতে মরক্কোকে ২–০ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স।

শুরু থেকেই বলের দখল আর আক্রমণে আধিপত্য ছিল দিদিয়ে দেশমের দলের। চতুর্থ মিনিটেই এমবাপ্পের শট ফিরিয়ে দেন বুনু। ২৫ মিনিটে আসে ম্যাচের প্রথম বড় মোড়। বক্সে এমবাপ্পেকে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। ভিএআরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্পটকিকে দাঁড়ান ফরাসি অধিনায়ক। কিন্তু তাঁর নিচু শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে আটকে দেন বুনু। বিশ্বকাপে (১৯৬৬ সালের পর) এনিয়ে সর্বোচ্চ চারটি পেনাল্টি সেভ দিয়েছেন মরক্কোর গোলরক্ষক।

দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো কিছুটা সাহসী হয়ে ওঠে। আজ্জেদিন উনাহি, ব্রাহিম দিয়াসরা বল নিয়ে সামনে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফরাসি রক্ষণ ভাঙার আগেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় ফ্রান্স।

৬০ মিনিটে দেজিরে দুয়ের পাস পেয়ে বক্সের ভেতর থেকে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে গোল করেন এমবাপ্পে। পেনাল্টি মিসের হতাশা এক মুহূর্তেই উড়িয়ে দেন তিনি। মাত্র ছয় মিনিট পর আবারও তাঁর পায়েই তৈরি হয় গোল। বক্সের বাইরে দাঁড়ানো দেম্বেলেকে বল বাড়িয়ে দেন এমবাপ্পে। ফরাসি উইঙ্গারের নিচু শট বুনুর হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে গেলে বোস্টনের গ্যালারিতে শুরু হয় ফরাসি উল্লাস।

দুই গোলের ধাক্কা সামলাতে সফিয়ান আমরাবাত, সফিয়ান রহিমি, গেসিম ইয়াসিনদের মাঠে নামান মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি। আশরাফ হাকিমির কর্নার থেকে নিল এল আইনাউইয়ের হেড অল্পের জন্য বাইরে যায়, উনাহির দূরপাল্লার শটও ঠেকিয়ে দেন মেনিয়াঁ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফরাসি রক্ষণে ফাটল ধরাতে পারেনি মরক্কো।

শেষ দিকে এমবাপ্পেকে তুলে নেন দেশম। বোস্টনের দর্শকেরা দাঁড়িয়ে করতালিতে বিদায় জানান ফরাসি অধিনায়ককে। সেটি ছিল আরেকটি স্মরণীয় রাতের স্বীকৃতি।

এই ম্যাচে এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে এমবাপ্পে আরও কয়েকটি ইতিহাস লিখেছেন। এবারের বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮, সঙ্গে ৩টি অ্যাসিস্ট। ১১টি গোলে সরাসরি অবদান রেখে ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের (১৩) পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপে এমন কীর্তি গড়েছেন তিনি। ফ্রান্সের জার্সিতে তাঁর মোট গোলে অবদান এখন ১০১টি—৬৪ গোল ও ৩৭ অ্যাসিস্ট, যা আর কেউ করতে পারেননি।

দেম্বেলের গোলটিও বিশেষ। বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫-এ। ফলে ২০০২ সালে ব্রাজিলের রোনালদো ও রিভালদোর পর প্রথম দল হিসেবে একই বিশ্বকাপে ৫ বা তার বেশি গোল করা দুই ফুটবলার পেল ফ্রান্স—এমবাপ্পে ও দেম্বেলে।

চার বছর আগে মরক্কোর রূপকথা থামিয়েছিল ফ্রান্স। বোস্টনের রাতেও সেই গল্পের শেষটা বদলাল না। বুনুর লড়াই ছিল, মরক্কোর বিশ্বাসও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দিলেন এমবাপ্পে।