গতবারের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলার সময়ের ঘটনা। আর্জেন্টিনা এবং ফ্রান্সের ফাইনাল দেখার জন্য আমরা সব বন্ধু আমাদের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অফিসে একত্রিত হয়েছি। সঙ্গে বিশাল খাওয়া দাওয়া। আমরা সবাই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার।

খেলা শুরুর আগে বউ ফোন দিয়ে বলল, ‘তুমি কই?’

বললাম, ‘সব বন্ধু একত্রিত হয়েছি। একসঙ্গে বড় পর্দায় খেলা দেখব।’

বউ উষ্মা প্রকাশ করে বলল, ‘আমার তাহলে কী হবে? আমি একা একা খেলা দেখব?’

আমার বউ আর্জেন্টিনার কঠিন ফ্যান। পারে তো আর্জেন্টিনার জেতার জন্য হুজুর ডেকে মিলাদের আয়োজন করে। সে ওয়াদা করে রেখেছে, আর্জেন্টিনা জিতলে দুজন ফকির খাওয়াবে।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘তোমার মেসি আছে না? আমি পাশে থাকলে ব্যাটার দিকে তুমি ভালো করে তাকাতেও পারবা না। তোমার ভালোর জন্যই আমি বাইরে খেলা দেখছি। শোনো, মেসি যদি গোল ফোল দেয়, আমারে জানাইও।’

বউ রাগ করে ফোন কেটে দিল। যখন আর্জেন্টিনা প্রথম গোল দিল, সত্যি সত্যি বউয়ের ফোন। উত্তেজিত গলায় বলল, ‘আর্জেন্টিনা তো দিয়ে ফেলছে!’

সব বন্ধু তখন আনন্দে লাফাচ্ছি। চিৎকার করছি। আমি আনন্দ বাদ দিয়ে বললাম, ‘কী দিয়ে ফেলছে?’

‘আরে, গোল!’

যখন দ্বিতীয় গোল হলো, আবারও বউয়ের ফোন। ভয়ংকর উত্তেজিত গলায় বলল, ‘আর্জেন্টিনা তো আবার দিয়ে ফেলছে। আমরা জিতে গেছি। ইয়াহু!’

আমি লাফালাফি বাদ দিয়ে শীতল কণ্ঠে বললাম, ‘আচ্ছা।’

উত্তেজনার ঠ্যালায় বেচারা ভুলে গেছে, আমিও বড় পর্দায় খেলা দেখছি! পরপর দুই গোল অবিশ্বাস্যভাবে ফ্রান্স শোধ করে ফেলল। বউ তো আর ফোন দেয় না। সবাই যখন আর্জেন্টিনার জন্য কাতর, আমি কাতর বউয়ের জন্য। বেচারার হার্ট এটাক হলো না তো! খেলা গেলে খেলা পাব, বউ মরলে বউ পাব কই!

আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের নব্বই মিনিট খেলা শেষের পথে। স্কোর তখন লেভেল। ভয়ে ভয়ে ফোন দিয়ে বললাম, ‘আছ না গেছ?’

বউ বিরক্ত গলায় বলল, ‘কই যামু?’

‘হার্ট এটাক-ফ্যাটাক হয় নাই তো?’

বউ কান্না কান্না কণ্ঠে বলল, ‘হার্ট এটাক হইতে বাকি আছে কী? আমি তো ঘামছি। এমবাপ্পের ফ্রান্স তো দুই গোলই শোধ করে ফেলছে। এখন মেসির কী হবে? আহা, মেসি!’

শেষ পর্যন্ত অসাধারণ খেলা দেখিয়ে মেসি বাহিনী জিতে গেছে। বাসায় ফিরতেই বউ বলল, ‘সকাল হলেই দৌড়ে গিয়ে দুইটা দেশি মুরগি নিয়ে আসবা। আমি ফকির খাওয়াব। আহা, মেসি! একটুর জন্য কাপ ফস্কে যাচ্ছিল।’

বললাম, ‘মেসি না খেললেও আজকে আর্জেন্টিনা জয়ী হতো। আর্জেন্টিনার দুই-তিনজন প্লেয়ার নামলেই হতো, এত প্লেয়ার নামানোর দরকার ছিল না। কোচ বিরাট ভুল করছে। তুমি শুয়ে পড়। নইলে প্রেসার বেড়ে যাবে। এই প্রেসার মেসি ছাড়া কেউ কমাতে পারবে না।’

বউ সত্যি সত্যি শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরই আবিষ্কার করলাম, যে বাঁশি মুখ দিয়ে রেফারি বিশ্বকাপে ফুটবলের মাঠে বাজাচ্ছিল, এখন আমার ঘরে বউ নাক দিয়ে সেটা বাজাচ্ছে। আমি একা একা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান দেখে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বউ জেগে আছে। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আহা! খুব মায়া লাগছে।’

সকাল সকাল মনটা খুশি হয়ে গেল। যাক, বউ এখনো তাহলে আমাকে মায়া করে! আর আমি কিনা ভাবছি...! কী লজ্জা! কী লজ্জা! গর্বে আমার বুক ফুলে উঠল। বউয়ের কাছে এমন মায়া কয়জনে পায়!

বউ বলল, ‘বেচারা এমবাপ্পে হ্যাট্টিক করেও হেরে গেল!’

লে হালুয়া! বউ আমাকে নয়, এমবাপ্পেকে মায়া করতেছে! ফুস করে বুক থেকে কিছু বাতাস বের হয়ে গেল। বউ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আচ্ছা, এমবাপ্পে যে এত ভালো খেলল, তার একটা পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল না?’

বললাম, ‘এমবাপ্পে পুরস্কার পাইছে তো।’

বউ খুশি খুশি গলায় বলল, ‘পাইছে? কী পুরস্কার পাইছে?’

‘জুতা।’

বউ আমার দিকে এমন করে তাকাল, পারে তো তক্ষুণি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়! আমার অনেক সময় লাগল বউকে বুঝাতে, এমবাপ্পে ভালো খেলে সত্যি সত্যি স্বর্ণের জুতা উপহার পেয়েছে।