গাইবান্ধার নদ-নদীর পানি কমলেও দ্বিগুণ হারে বেড়েছে ভাঙন। অব্যাহত ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও সহস্রাধিক বসতভিটা। চোখের সামনে নিজেদের শেষ সম্বল হারিয়ে এবং বাড়িঘর হারানোর আতঙ্কে দিন পার করছেন নদীপাড়ের হাজারো পরিবার।
সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব মানুষের মাথায় এখন যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। চাষাবাদ ও কর্ম হারিয়ে তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবিকা নির্বাহ।
ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) লোকদেখানো সামান্য কিছু জিও ব্যাগ ফেলেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। ভাঙন রোধে তারা দ্রুত ও স্থায়ী ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের পুটিমারি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে নদীভাঙনের এক ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। নদী তীরবর্তী যত দূর চোখ যায়- কচুক্ষেত, পাটক্ষেত, গাছের বাগান সবকিছুই নদীগর্ভে তালিয়ে যাচ্ছে। এই গ্রামের বাসিন্দা জেলেখা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “নাই বাওয়া, হামার কিচ্ছু নাই। এক ব্যাটা (ছেলে) তাই ঢাকাত গেচে। এই নদীত যে কতবার ঘর-বাড়ি, জমি সইগ হারাচি, সেটা কলে (বললে) বিশ্বাস হবার নয়। এখন আর একটা মাত্র ঘর ছাড়া কিছুই নাই।”
একই গ্রামের গৃহস্থ সৈয়দ জামাল আজ থেকে দুবছর আগেও ১০০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন। নদীর মাঝখানটা দেখিয়ে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, “আগে পাট, কচু, ধান এবং গরুর জন্য ঘাস আবাদ করতাম। কিন্তু এই কয়েকদিনেই চোখের সামনে আমার ৭০ থেকে ৮০ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজনসহ আরো শত বিঘা জমি শেষ।”
তিনি আরো বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বলেও লাভ হয় না। তারা ট্রলারে করে কয়েক ব্যাগ বালুর বস্তা ফেলে দিয়ে যায়, অথচ বিল ঠিকই হাজার হাজার বস্তার করবে। বউ, ছোল (সন্তান) নিয়্যা বান্দত (বাঁধ) যায়া আশ্রয় নিচি। সংসার চলবে কেমন করি, সেই চিন্তাত রাতত ঘুম পারবের পাইন্যা।”
একই গ্রামের আমজাদ হোসেন চলতি বছর ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে কচু আবাদ করেছিলেন, যার সবই এখন নদীগর্ভে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওমরা (পাউবো) যে জাগাত আসি বস্তা ফেলায়, সেটি ধান-পাট কিছুই নাই। আর হামার এই পাটের জমি গুল্যা ভাঙি শ্যাষ হয়া গেল, সেগল্যা ওমার চোখত পড়ে না।”
শ্রীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম জানান, প্রায় দুই মাস ধরে তার এলাকায় ভাঙন চলছে। এ পর্যন্ত তার ইউনিয়নে ৭০ থেকে ৭৫টি পরিবারের প্রায় ৩০০ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে এবং বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে।
গাইবান্ধার ভাঙনকবলিত আরেকটি অন্যতম এলাকা হলো ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব রসুলপুর গ্রাম। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে এই পুরো গ্রামটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর আগে রসুলপুর মৌজায় নতুন চর জেগে উঠলে মানুষ আবার সেখানে ফিরে এসে ঘরবাড়ি ও কৃষিকাজ শুরু করে।
কিন্তু চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের পানি ওঠানামার সাথে সাথে রসুলপুর চরের বিভিন্ন অংশে নতুন করে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এক বছর আগেই জমি-ঘর হারানো আলম মিয়া জানান, “এবার আবারো সইগ জমি শ্যাষ হবার নাগচে। এখন পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোক আসি একটা বস্তাও ফেলে দিলনা। হামরা এগল্যা তাহলে কেটা রক্ষা করবে?”
৪ বার তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়ে ফুলছড়ির রসুলপুরে আশ্রয় নেওয়া রহিমা বেগম বলেন, “ভিক্ষা করে কোনো রকমে জীবন চলতো। এখন নদী সেই শেষ জায়গাটিও কেড়ে নিচ্ছে। এখন কোথায় যাব, কীভাবে থাকব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই।”
কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহেল রানা সালু বলেন, “আমার ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে এ পর্যন্ত শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এছাড়া ৫০টির অধিক পরিবার তাদের বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছেন।”
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, “জেলার সাত উপজেলায় বন্যায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া নদীভাঙনে এ পর্যন্ত মোট ১১৬ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিক মজিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, প্রতি বছর একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েও কেন স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না? যেসব এলাকায় প্রতি বছর ভাঙনের ঝুঁকি দেখা দেয়, সেখানে আগাম পরিকল্পনা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার চার উপজেলা- সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটার নদী তীরবর্তী এলাকা রক্ষায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটার নদী শাসন রক্ষা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। এছাড়া ২৯টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, “আপাতত জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে আগামী শুকনো মৌসুমে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন আর কোনো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হবে না।”








