বিশ্বকাপ এলেই ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ফ্রান্স। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দেশটি শুধু শক্তিশালী ফুটবল দল, কিংবদন্তি খেলোয়াড় বা শৈল্পিক খেলার জন্যই পরিচিত নয়; ফ্রান্স মানেই ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, ফ্যাশন, রন্ধনশৈলী এবং হাজার বছরের সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্রান্সের ধারাবাহিক সাফল্য দেশটিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও যুক্তিবাদী সমাজ হিসেবে পরিচিত এই দেশে এখনো টিকে আছে বহু পুরোনো বিশ্বাস ও কুসংস্কার। শহুরে জীবনে অনেকেই এগুলোকে নিছক ঐতিহ্য বলে মনে করলেও, গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও এসব বিশ্বাসের প্রভাব দেখা যায়।

১. উল্টো করে রাখা রুটি অশুভ
ফ্রান্সের সবচেয়ে পরিচিত কুসংস্কারগুলোর একটি হলো রুটি কখনো উল্টো করে টেবিলে রাখা যাবে না। মধ্যযুগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী জল্লাদের জন্য আলাদা করে রুটি উল্টো করে রাখা হতো। সেই ঐতিহাসিক প্রথা থেকেই বিশ্বাস জন্মেছে, উল্টো রুটি দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। আজও অনেক বেকারি ও পরিবারে রুটি ভুল করে উল্টো রাখা হলে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন
মুক্তিযুদ্ধে ফুটবল ছিল অস্ত্র, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ইতিহাস জানেন?
২. নতুন বছরে মিসলটো শুভ
বড়দিন ও নববর্ষের সময় দরজায় মিসলটো ঝুলিয়ে রাখার রীতি ফ্রান্সে বহু পুরোনো। বিশ্বাস করা হয়, এটি সৌভাগ্য, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। নতুন বছরে মিসলটোর নিচে চুম্বন করার রীতিও জনপ্রিয়।

৩. লবণ ছড়িয়ে পড়া অমঙ্গলের লক্ষণ
খাওয়ার টেবিলে অসাবধানতাবশত লবণ পড়ে গেলে অনেক ফরাসি এটিকে অশুভ সংকেত হিসেবে দেখেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্ভাগ্য এড়াতে ডান হাতে সামান্য লবণ তুলে বাম কাঁধের ওপর দিয়ে ছুড়ে ফেলতে হয়।
৪. আয়না ভাঙলে সাত বছরের দুর্ভাগ্য
আয়না ভাঙা মানেই দীর্ঘ সময়ের দুর্ভাগ্য-এই বিশ্বাস ফ্রান্সেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত। রোমান যুগের একটি ধারণা থেকে এর উৎপত্তি বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। এখনো অনেকেই অকারণে আয়না ভাঙাকে ভালো চোখে দেখেন না।

৫. চার পাতার ক্লোভার সৌভাগ্যের প্রতীক
তিন পাতার ক্লোভার সহজে পাওয়া গেলেও চার পাতার ক্লোভার অত্যন্ত বিরল। ফরাসিদের বিশ্বাস, এটি খুঁজে পাওয়া মানেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন। তাই অনেকেই এটি সংরক্ষণ করে রাখেন সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। ৭টি চার পাতার ক্লোভার খুঁজে পাওয়া মানে মনের আশা পূরণ হওয়া এমনই বিশ্বাস ফরাসিদের।

৬. নতুন বাড়িতে প্রবেশের আগে সৌভাগ্যের প্রতীক
অনেক ফরাসি পরিবার নতুন বাড়িতে ওঠার সময় রুটি, লবণ বা মুদ্রা নিয়ে প্রবেশ করেন। তাদের বিশ্বাস, এতে নতুন জীবনে খাদ্য, সম্পদ ও সুখ-সমৃদ্ধি বজায় থাকে। অঞ্চলভেদে এই রীতিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল বিশ্বাস একই।

৭. শুক্রবার ১৩ তারিখকে ভয়
পশ্চিমা বিশ্বের মতো ফ্রান্সেও শুক্রবার ১৩ তারিখ নিয়ে নানা বিশ্বাস প্রচলিত। অনেকেই এই দিনে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত, নতুন ব্যবসা শুরু বা গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ এড়িয়ে চলেন। যদিও অন্য একটি অংশ আবার এটিকে সৌভাগ্যের দিন বলেও মনে করেন। ফলে এই দিনকে ঘিরে লটারির টিকিট বিক্রিও অনেক সময় বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
শিশুদের হাত ধরে কেন মাঠে আসেন খেলোয়াড়রা? জানুন এর রহস্য
৮. কাঠে তিনবার টোকা দেওয়া
কোনো ভালো খবর বলার পর বা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করলে অনেক ফরাসি কাঠে তিনবার টোকা দেন। এর উদ্দেশ্য হলো দুর্ভাগ্য বা অশুভ শক্তিকে দূরে রাখা। বাংলায় যেমন অনেকে ‘নজর না লাগুক’ বলেন, তেমনি এটি এক ধরনের প্রতীকী অভ্যাস।

৯. ঘরের ভেতর ছাতা খোলা নিষেধ
ঘরের ভেতরে ছাতা খুললে দুর্ভাগ্য নেমে আসে এমন বিশ্বাস ফ্রান্সেও প্রচলিত। যদিও আধুনিক সময়ে এটি অনেকটা নিরাপত্তাজনিত যুক্তির সঙ্গে মিশে গেছে, তবুও বহু পরিবার এখনও এই নিয়ম মেনে চলে।
১০. মইয়ের নিচ দিয়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা
রাস্তার পাশে কোনো মই দাঁড়িয়ে থাকলে তার নিচ দিয়ে হাঁটতে চান না অনেক ফরাসি। ধারণা করা হয়, মই দেয়ালের সঙ্গে মিলে ত্রিভুজ আকৃতি তৈরি করে, যা ধর্মীয়ভাবে পবিত্র প্রতীক। সেই জায়গা অতিক্রম করা অশুভ বলে ধরা হয়।

আধুনিক ফ্রান্সেও কেন টিকে আছে এসব বিশ্বাস?
প্যারিসের ঝলমলে নগরজীবন, বিশ্বের অন্যতম উন্নত প্রযুক্তি, উচ্চমানের শিক্ষা কিংবা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পরও ফ্রান্স তার ঐতিহ্যকে ভুলে যায়নি। অনেক ফরাসি এসব কুসংস্কারকে অন্ধবিশ্বাস হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেন। বিশেষ দিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা উৎসবে এসব রীতি পালন করার মাধ্যমে তারা অতীতের সঙ্গে এক ধরনের আবেগের বন্ধন বজায় রাখেন।
বিশ্বের অন্যতম পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ ভ্রমণ করেন। আইফেল টাওয়ার, ল্যুভর জাদুঘর, প্রোভঁসের ল্যাভেন্ডার ক্ষেত কিংবা ফরাসি ক্যাফে সংস্কৃতির পাশাপাশি এই লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কারও দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক পর্যটক স্থানীয়দের কাছ থেকে এসব গল্প শুনে বিস্মিত হন, আবার অনেকে কৌতূহলবশত নিজেরাও ঐতিহ্যগুলো অনুসরণ করেন।
আরও পড়ুন
আর্জেন্টাইনরা কেন এত কুসংস্কার মানেন? ম্যাচের আগে খেলোয়াড়রা যা করেন
ফুটবল মাঠে ফ্রান্সের জয়, ফ্যাশনের বিশ্বনেতৃত্ব কিংবা শিল্প-সাহিত্যে অসাধারণ অবদান সবকিছুর আড়ালে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন একটি সমাজ, যার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতিতে। তাই ফ্রান্সকে শুধু আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দেশটি একই সঙ্গে বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল এবং ঐতিহ্যনির্ভর যেখানে যুক্তির পাশাপাশি লোকবিশ্বাসও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে আছে।
সময়ের সঙ্গে অনেক কুসংস্কারের গুরুত্ব কমেছে, কিন্তু মানুষের গল্প, স্মৃতি ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এগুলো এখনও ফ্রান্সকে দিয়েছে এক আলাদা পরিচয়। আর সে কারণেই বিশ্বকাপের মাঠে কিংবা ভ্রমণের মানচিত্রে ফ্রান্সকে জানার আগ্রহ কখনোই শুধু তার সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিস্তৃত হয় তার সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনের অজানা অধ্যায়ের দিকেও।
সূত্র: গো গো ফ্রান্স
কেএসকে








