দুই শিক্ষকের মাঝে হাতাহাতির একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ৫ মিনিটের ওই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সবার নজরে আসে। এতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনরা।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ৩৭ নং ছলিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ ও সহকারী শিক্ষক তানভীর রেজার মধ্যে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ের বারান্দায় প্রাত্যহিক সমাবেশ চলাকালে দুই শিক্ষকের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে বিদ্যালয়টির বারান্দায় শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধ করে সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসময় প্রধান শিক্ষক সহকারী শিক্ষক তানভীর রেজা ও তার স্ত্রী ইসরাত জাহানকে সমাবেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বলেন। বেশ কয়েকবার বলার পরও ওই দুই শিক্ষক একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন। একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক তাদের ধমক দিলে সহকারী শিক্ষক ইসরাত জাহান তাকে ব্যবহার ঠিক করতে বলেন। একপর্যায়ে অন্য সহকারী শিক্ষক তানভীর রেজা প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে তানভীর রেজা তেড়ে এসে প্রধান শিক্ষকের হাতে থাকা মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে দুজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
বিদ্যালয়টিতে কর্মরত অন্যান্য শিক্ষকরা বলেন, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের এমন ঘটনা তাদের কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন ঘটনায় একদিকে যেমন শিক্ষকরা পাঠদানে মনোযোগ হারাচ্ছেন একই সঙ্গে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সলিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দীর্ঘ ১৩ বছর যাবৎ এই প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। সহকারী শিক্ষক তানভীর রেজা ও ইসরাত জাহান সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। সম্প্রতি তারা দুইজন মিলে বিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছে।
ওই শিক্ষক দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে সহকারী শিক্ষক তানভীর রেজা ও তার স্ত্রী ইসরাত জাহান সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ের আসেন না। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির দাপ্তরিক কোনো কাজে ও প্রাত্যহিক সমাবেশ কোনো ধরনের সহযোগিতা করেন না। এছাড়াও সম্প্রতি ওই শিক্ষক দম্পতি তাদের দুই সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন। এমনকি ক্লাসরুমে পর্যন্ত বাচ্চা নিয়ে প্রবেশ করেন। ক্লাসে এবং অফিসকক্ষে বাচ্চাদের খাওয়ানোসহ সমস্ত কাজ করেন এবং অবসর সময় পেলে দোতলার একটি কক্ষে বাচ্চাদের নিয়ে আড্ডা দেন।
প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করে আরও বলেন, ঘটনার দিন ওই শিক্ষক দম্পতিকে বারবার বলার পরও তারা সমাবেশে যোগ দেয়নি। পরে আমি ভিডিও করতে বাধ্য হয়েছি। বিষয়টি মৌখিকভাবে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানোর পরও কোনো সমাধান না পেয়ে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে বাধ্য হয়েছি।
শিক্ষক দম্পতি তানভীর রেজা ও ইসরাত জাহান বলেন, ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে প্রধান শিক্ষক তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। বরং প্রধান শিক্ষকই বিদ্যালয়ে কোনো শ্রেণিতে পাঠদান করেন না। তার আচরণ এরকম যেন সবসময় সহকারী শিক্ষকদের তার গোলাম মনে করেন। প্রতিষ্ঠানের বাহিরেও অনেক সময় নিজের ব্যক্তিগত কাজে হুকুম করেন তিনি। সেগুলো করতে আপত্তি জানালেই নানা রকম অভিযোগ তোলেন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
শিক্ষক দম্পতি আরও বলেন, সম্প্রতি সমাবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে সেটা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়েছে। যা নিয়ে উপজেলা জুড়ে নানা সমালোচনা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করতে পারতেন। তাদের দাবি, একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান হয়ে এভাবে ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করায় তিনি চরম দায়িত্বহীনতার প্রমাণ দিয়েছেন।
বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বলেন, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন যাবৎ সুনামের সঙ্গে পরিচালনা হয়ে আসছিলো। কিন্তু সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র স্থানে শিক্ষকদের এমন আচার-আচরণ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিক্ষকদের দীর্ঘ দিনের এ দ্বন্দ্বে একদিকে যেমন বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নেমেছে নিম্ন পর্যায়ে, একইসঙ্গে কমেছে শিক্ষার্থীসংখ্যাও। তাই দ্রুতই উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদ্যালয়টিতে পূর্বের ন্যায় পড়াশোনা পরিবেশ সৃষ্টি করবে এমনটা প্রত্যাশা করেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীনা আক্তার বলেন, এখন পর্যন্ত এসব ঘটনায় লিখিত কোনো অভিযোগ পায়নি। শিক্ষকদের মধ্যে এ ধরনের আচরণ সত্যিই লজ্জাজনক। তবে বিদ্যালয়টিতে যেন শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকে সেদিকে বিবেচনা করে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
শেখ মহসীন/এসজেডএইচ/জেআইএম








