টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কার্যত পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, ভেঙে গেছে বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ, ডুবে গেছে গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তবে এবারের দুর্যোগে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, নতুন করে আলোচনায় এসেছে কক্সবাজার রেলপথ। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইন নির্মাণে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত কালভার্ট না থাকায় অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে বিল-ঝিল ও নিম্নাঞ্চলের পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থেকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারী বর্ষণের প্রবণতা বাড়ছে। তাই বড় অবকাঠামো নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি সমান গুরুত্ব না পেলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

পানি নিষ্কাশনে নতুন বাধা?
রামু, ঈদগাঁও, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও চকরিয়ার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগে বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে বিল-ঝিল পেরিয়ে নদীতে যেত। কিন্তু রেললাইন নির্মাণের পর সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির চাইল্যাতলীর বাসিন্দা ফারুক আহমদ বলেন, রেলপথ নির্মাণের সময় প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম সংখ্যক কালভার্ট করা হয়েছে। যেগুলো হয়েছে, তার অনেকগুলো সঠিক স্থানে নয়। ফলে নিচু এলাকার পানি আটকে যাচ্ছে। সেই পানি এখন সড়ক ডুবিয়ে বসতবাড়িতে ঢুকছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় কয়েকদিন ধরে চুলা জ্বলছে না।
ঈদগাঁওয়ের নাসির উদ্দিন জানান, চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত রেললাইন অনেক জায়গায় কার্যত বাঁধের মতো কাজ করছে। পানি চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় আরও বেশি কালভার্ট প্রয়োজন ছিল।
আরও পড়ুন
জলাবদ্ধতায় স্থবির উত্তর চট্টগ্রাম, থমকে গেলো যোগাযোগ-শিক্ষা কার্যক্রম
স্থানীয় সূত্র জানায়, জমে থাকা পানি এখন কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও প্লাবিত করছে। রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির কাঠিরমাথা, মিঠাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা, পানেরছড়া, চাইল্যাতলীসহ একাধিক স্থানে মহাসড়কের ওপর দিয়ে দুই ফুটেরও বেশি পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল বাস ও মিনিবাস ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

এছাড়া রামুর খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদ নগর, কচ্ছপিয়া, ফতেখারকুল, চাকমারকুল, উখিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম, কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বুক সমান পানিতে ডুবে আছে। একই অবস্থা ঈদগাঁওর জালালাবাদ, পোকখালী, ইসলামাবাদ, ভোমরিয়াঘোনা, দরগাহপাড়া, মাইজপাড়ায়। এসব এলাকায় জমা পানি রেলপথের জন্য দ্রুত নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে
চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চিরিংগা সেতু পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চিরিংগা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ধরা হয় ৫ দশমিক ৮ মিটার। সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ৬ দশমিক ২৯ মিটার। মাতামুহুরীর উজানে বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন
‘পানি এত দ্রুত এলো, কিছুই সরানোর সুযোগ পাইনি’
চকরিয়ার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা, পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়ন এবং মাতামুহুরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ঢলের পানি ঢুকেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো পানির নিচে চলে যাওয়ায় বহু এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। নিরাপদ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
পাউবো সূত্র জানায়, মাতামুহুরীর নদীর কোনাখালী পুরুইত্যাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। পৌরসভার ভাঙারমুখ, আমাইন্যারচর, নামার চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালীর পুরুইত্যাখালী, মরংঘোনা এলাকায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বাঁধ রয়েছে ঝুঁকিতে।
বাড়ছে মানবিক সংকট
ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী নদীতেও দু’কুল উপছে ঢল নেমেছে। ঢলে ভেসে আসা লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে সাজেদ (১২) নামে এক মাদরাসাছাত্র নিখোঁজ রয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফুলেশ্বরী নদীর রামুর ঈদগড় পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ সাজেদ ঈদগড় ইউনিয়নের হাসনাকাটা কুনারপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। সে চরপাড়া নুরানি মাদরাসার শিক্ষার্থী।
ঈদগাঁওর ভোমরিয়াঘোনার সমাজকর্মী মোস্তফা কামাল জানান, পশ্চিম ভোমরিয়াঘোনা, চৌধুরীপাড়া, উত্তরপাড়া, কানিয়ারছড়াসহ নিম্নাঞ্চল ঢলের পানিতে ডুবে রয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এ ভোগান্তি পোহাচ্ছে এলাকার অর্ধলাখ মানুষ। অনেকের রান্নাও বন্ধ। প্রশাসনিক কোনো সহায়তা নেই।
আরও পড়ুন
চন্দনাইশ / টানা বৃষ্টিতে পানির নিচে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক
চকরিয়া শান্তিবাজার এলাকার আবদুল হক বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে এলাকাটি পানিবন্দি-প্রশাসন কিংবা অন্য কারো সহযোগিতা আসেনি। রান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের নারী-শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছি।
মাতামুহুরী কোনাখালীর বাসিন্দা হারুন রশিদ বলেন, এ বছর বৃষ্টিতে বিলে যেমন পানি বেড়েছে মাতামুহুরী নদীতেও তেমন পানি বেশি। প্রভাবশালীরা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
চকরিয়ার ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার নতুন কিছু ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় ধসে দুই শিশু নিহত হয়েছে। এরই মধ্যে চকরিয়া উপজেলায় ২০ টন ও মাতামুহুরীতে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, মাতামুহুরীসহ জেলার আরও কয়েক নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি বেড়েই চলেছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, গত শনিবার ২৮ মিলিমিটার, রোববার ২৪০, সোমবার ১২৯, মঙ্গলবার ৬৯, বুধবার ১২৫ এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৫৭ মিলে ৬ দিনে ৬৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আরও দু-দিন অতি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রশাসনের প্রস্তুতি
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ টাকা এবং প্রায় দেড় হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, জেলায় প্রায় ৯৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তালিকা মিলেছে। ১৩ রোহিঙ্গাসহ মারা গেছেন ১৯ জন। দূর্যোগ বিবেচনায় ৬৪০টি সাইক্লোন শেল্টার খোলা রাখা হয়েছে। নিহত স্থানীয় ৪ পরিবারে একলাখ আর আহত দুই পরিবারে ৩০ হাজার টাকা এবং ৫৫৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
আরও কতদিন ভারী বৃষ্টি থাকবে, জানালো আবহাওয়া অফিস
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি ক্রমে অবনতি হচ্ছে। জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখা হলেও কেউ অবস্থান করছে বলে তথ্য নেই। দুর্যোগ মোকাবিলায় নগদ ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিকটন চাউল, প্রায় দেড় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। আরও বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
এসএএল/কেএইচকে/জেআইএম








