টানা বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় দেখা দিয়েছে পর্যটক খরা। বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে সাপ্তাহিক ছুটিকে ঘিরে পর্যটকের যে ঢল নামার কথা ছিল, তা দেখা যায়নি।

এদিকে অনেক পর্যটক আগাম বুকিং বাতিল করায় বিপাকে পড়েছেন আবাসিক হোটেল-মোটেল মালিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইড, অটোরিকশা চালক ও সৈকতসংলগ্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েকদিন ধরে কুয়াকাটার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। থেমে থেমে বৃষ্টির সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া। উত্তাল সমুদ্রের কারণে সৈকতে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। যারা কুয়াকাটায় এসেছেন, তারাও অধিকাংশ সময় আবাসিক হোটেলের কক্ষেই অবস্থান করেছেন। ফলে সৈকতজুড়ে ছিল নির্জন পরিবেশ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যেখানে সৈকতে হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে, সেখানে শুক্রবারও ছিল অনেকটাই ফাঁকা।

হোটেল সি প্যালেসের পরিচালক মো. রুবেল হোসেন বলেন, হোটেল সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্টে হওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটিতে সাধারণত শতভাগ অগ্রিম বুকিং থাকে। কিন্তু আজ তিনটি কক্ষের বুকিং বাতিল হয়েছে। খুলনা থেকে নিয়মিত আসা একদল পর্যটক সকালে ফোন করে বুকিং বাতিল করেছেন। একইভাবে মাদারীপুর থেকে আসার কথা ছিল একটি গ্রুপও দুটি কক্ষের বুকিং বাতিল করেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে আরও বুকিং বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হোটেল খান প্যালেসের ব্যবস্থাপক খান মো. রাসেল বলেন, হোটেলে এখন পর্যন্ত কোনো বুকিং বাতিল হয়নি। তবে শুক্রবার সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবার বুকিং হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। আবহাওয়া ভালো থাকলে আরও অনেক পর্যটক আসতেন।

কুয়াকাটায় পর্যটক খরা, বাতিল হচ্ছে হোটেল বুকিং
পর্যটক না থাকায় অলস সময় পার করছেন কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

সৈকতের কফি বিক্রেতা সজিব বলেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সাধারণত ভালো বিক্রি হয়। কিন্তু সারাদিন বৃষ্টির কারণে মানুষ সৈকতে নামছে না। সকাল থেকে খুব অল্প কয়েকজন ক্রেতা পেয়েছি। বিক্রি নেই বললেই চলে।

বৃহস্পতিবার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ঘুরে দেখা যায়, পর্যটক না থাকায় অটোরিকশা চালক, ট্যুর গাইড, ট্যুর অপারেটর, সৈকতসংলগ্ন দোকানদার ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। অনেকেই যাত্রী ও ক্রেতার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও মিলছে না কোনো সাড়া। ফলে দৈনিক আয়-রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, কুয়াকাটার অর্থনীতি অনেকাংশেই পর্যটননির্ভর। বৈরী আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু হোটেল-মোটেল নয়, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর গাইড, ফটোগ্রাফার, অটোরিকশা চালক ও সৈকতকেন্দ্রিক হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, টানা বৈরী আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টিপাত এবং উত্তাল সমুদ্রের কারণে কুয়াকাটায় পর্যটকের আগমন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে হোটেল-মোটেলগুলোর কক্ষ দখলের হার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক পর্যটক আগে থেকেই কক্ষ বুকিং দিলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ বুকিং বাতিল করেছেন। এতে হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু হোটেল নয়, পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল রেস্তোরাঁ, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইড, যানবাহন চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সৈকতকেন্দ্রিক অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও কর্মহীন সময় পার করছেন। এখন সবাই আবহাওয়ার উন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও পর্যটকের আনাগোনা বাড়বে বলে আশা করছি।

পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মাহবুবা সুখী বলেন, সুস্পষ্ট নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পরে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যেতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বিরাজ করছে। ফলে উত্তর বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আসাদুজ্জামান মিরাজ/এসজেডএইচ/জেআইএম