সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদীয় দল থেকে পদত্যাগ কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে ওই আসন শূন্য হবে। এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ না করলে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ শূন্য হবে না বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষেজ্ঞরা।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ অথবা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যায়। অন্যদিকে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী না হলে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন। সে ক্ষেত্রে গাজী নজরুলের পদ শূন্য হবে। তবে বাংলাদেশে সংবিধানের নির্দেশনাকে সর্বোচ্চ আইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যেসব কারণে কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য বিবেচিত হন, সেগুলো সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে। তার একটি হলো—নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধ। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

সংবিধানে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁর মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে। অন্যদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, নির্বাচনে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে শুধুমাত্র পদত্যাগের কথা আছে। সে কারণে এমপির পক্ষ থেকে দাবি করা যাবে, তিনি পদত্যাগ যেহেতু করেন নাই এবং তাঁর পদ বহাল আছে। তবে যে দল থেকে তিনি নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, সে দল তাঁকে বহিষ্কার করেছেন। এখন তিনি সংসদ সদস্য থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। ওনার উচিত হবে পদত্যাগ করা।’

আইনজীবীরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে এমপি পদ হারাবেন। কিন্তু নৈতিক স্খলনজনিত কারণে দল তাঁকে বহিষ্কার করলে পদ যাবে না। তবে এটি দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার চেয়েও গুরুতর অপরাধ। এখানে অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী।

ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্যকে তাঁর মনোনয়নদাতা রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্যপদ হারান না। তবে সংবিধানের ৬৬ (২) (গ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি আইন দ্বারা বা আইনের অধীনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হন, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ারও অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।’

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে তাঁকে হয় কোনো দলের মনোনীত প্রার্থী হতে হয় অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হয়। দলীয় প্রার্থীরা সংসদে দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার কথা বলা আছে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে এবং জাতীয় নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও)। এখানে যেসব অযোগ্যতার কথা বলা আছে, তাতে নির্বাচিত হওয়ার পরও কারও সে অযোগ্যতা তৈরি হলে তিনি পদ হারাতে পারেন।

এ বিষয়ে ইমরান সিদ্দিক বলেন, ‘আরপিও-এর ১২ অনুচ্ছেদের খ দফায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী না হলে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন। যেহেতু সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাই যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন আর বহাল রাখেননি। ফলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন এবং সে কারণে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হয়েছে বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো বিরোধ বা আইনগত প্রশ্ন দেখা দিলে, সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমকে জানান, নৈতিক স্খলনের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে এখনো কোনো চিঠি পায়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাঁকে বহিষ্কারের চিঠি আসলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আইনগত দিক থেকে বহিষ্কার করলেই সংসদ সদস্যপদ যাবে না। এ ক্ষেত্রে পদত্যাগ করলেই সংসদ সদস্যপদ যাবে।’

এদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকার নজির রয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় জোট সরকারের আমলে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আবু হেনা। তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তখন আবু হেনার সংসদ সদস্যপদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার।

এরপর ২০১৪ সালে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে দল থেকে বহিষ্কারের পরও তিনি সঙ্গে সঙ্গে সংসদ সদস্য পদ হারাননি। পরে তিনি নিজেই সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।