দেশের বৃহত্তম পোশাক শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে বসবাসরত তৈরি পোশাক শ্রমিকের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক ‘শ্রমিক বিশেষায়িত হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জমি বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল (বুধবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।

সাক্ষাৎকালে তারা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে বিদ্যমান সংকট নিরসন, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ রপ্তানি বাণিজ্যের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নীতিগত সহায়তা কামনা করেছেন।

অন্য দাবির সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করতে জমি বরাদ্দ চান বিজিএমইএ নেতারা।

বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও উপদেষ্টা মাহদি আমিন।

আরও পড়ুন

পোশাকশিল্পের বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

সাক্ষাৎকালে বিজিএমইএ নেতারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকার লক্ষ্যে সমন্বিত শুল্ক-কর, আর্থিক ও রপ্তানি সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সার্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও সুরক্ষা নিশ্চিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিম্নলিখিত একগুচ্ছ প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ

কারখানাগুলোর উৎপাদন সচল রাখা ও সঠিক সময়ে পণ্য শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে গ্যাস এবং বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও বিকল্প উপায়ে কারখানা চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধির সার্বিক চিত্র বৈঠকে তুলে ধরা হয়। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাস্টমস, ব্যাংকিং, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ যাবতীয় সরকারি সেবা দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি ব্যবস্থা দ্রুত চালুর জোর দাবি জানান বিজিএমইএ নেতারা।

কাস্টমস বন্ড অডিট সহজীকরণ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা বন্ড কর্তৃপক্ষের ঘন ঘন অডিটের জটিলতা দূর করতে শীর্ষস্থানীয় পেশাদার অডিট ফার্মগুলোর মাধ্যমে বার্ষিক কাস্টমস অডিট সম্পন্ন করার স্থায়ী নীতিমালার প্রস্তাব করা হয়।

বিমানবন্দরে অস্থায়ী কার্গো শেড নির্মাণ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং ধারণক্ষমতার স্বল্পতায় লিড টাইম বাড়ায় জরুরিভিত্তিতে একটি ‘অস্থায়ী কার্গো শেড’ নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়।

গাজীপুরে শ্রমিক হাসপাতালের জন্য জমি বরাদ্দ

দেশের বৃহত্তম পোশাক শিল্প হাব গাজীপুরে লাখ লাখ শ্রমিকের মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিজিএমইএ একটি আধুনিক ‘শ্রমিক বিশেষায়িত হাসপাতাল’ নির্মাণ করতে চায়। এজন্য উপযুক্ত খাস জমি বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড সহজীকরণ

কারখানার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড পরিপালন সহজ করার প্রস্তাব করা হয়।

বেনাপোল বন্দরে লজিস্টিকস সহজীকরণ

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি সহজ করা ও মিথ্যা ঘোষণা রোধসহ ভারতে পোশাক রপ্তানি বাড়াতে বন্দরে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর একটি যৌথ সেবা কেন্দ্র/ডেস্ক স্থাপনের অনুমতি চাওয়া হয়।

আরও পড়ুন

আবাসন খাত উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিহ্যাবের ৬ প্রস্তাব

এ ছাড়াও ‘বাটেক্সপো ২০২৬’ আয়োজন ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি কামনা করেন নেতারা।

আগামী নভেম্বর ২০২৬ এ অনুষ্ঠেয় এ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য বিজিএমইএ পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী এতে সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন, বলে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি অনুযায়ী পোশাক খাতে শতভাগ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের (সার্কুলারিটি) অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়।

বিজিএমইএ নেতারা টেক্সটাইল বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে সংগঠনের চলমান বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ তুলে ধরেন। বিজিএমইএ সভাপতি জানান, ইইউর পরিবেশবান্ধব নীতি পরিপালন ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে দেশীয় পোশাক শিল্পের অবস্থান সুদৃঢ় করতে বিজিএমইএ কাজ করে যাচ্ছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে পোশাক শিল্পের অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল উত্থাপিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের সুরক্ষা, সচল কারখানাগুলোর স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ, নীতিগত সহায়তা সহজীকরণ ও বন্ধ কারখানা সচল করতে সরকারের ধারাবাহিক নীতি সহায়তার আশ্বাস দেন।

বৈঠকে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল উত্থাপিত ইস্যুগুলো পর্যালোচনা ও সমাধানে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী এবং পরিচালকরা।

আইএইচও/এএসএ