২০২৪ সালের ৫ আগস্ট লাখো মানুষের দখলে ছিল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবন। তারপর পেরিয়েছে দুই বছর। সেই গণভবনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে গতকাল বুধবার সকালে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাদুঘরটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে আজ বৃহস্পতিবার। তবে সাধারণ মানুষের যেন তর সইছে না।
জুলাইয়ের স্মৃতির খোঁজে গতকালই জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে ও আশপাশে অনেক মানুষকে ভিড় করতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ভিড় আরও বেড়েছে। জাদুঘরের দক্ষিণের গেটে কথা হয় কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, এমন তথ্য শুনেই তাঁরা এসেছিলেন। তবে ঢুকতে না দেওয়ায় মন খারাপ করে বাড়ি ফিরছেন। কেউ কেউ গণভবন ঘুরে দেখতে না পেরে পাশের জিয়া উদ্যান ঘুরে দেখেছেন।
জাদুঘরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা হাবিবুর রহমান জানান, আজ বৃহস্পতিবার জাদুঘর সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। অনলাইনে টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করা যাবে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা মো. শাহজাহান (৫৯) ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। গতকাল তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেখতে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে না পেরে গ্রিল ঘেরা বেষ্টনীর ফাঁক গলে দেখছেন জাদুঘরের ভেতরের চিত্র। ভেতরে দেখা যায়, সবুজ মাঠ চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাস্কর্য, জুলাই আন্দোলনের সময় লেখা জনপ্রিয় বিভিন্ন দেয়াল চিত্র, স্লোগান, পুরোনো লাল দেয়ালের ভাঙা অংশ, শেখ হাসিনার মুখাবয়ব ও আন্দোলনরত তরুণদের ছবি দিয়ে তৈরি বিশেষ শিল্পকর্ম। শাহজাহান বলেন, ‘৫ আগস্ট থেকে যেন সবাই শিক্ষা নেয়। জনগণ জাগলে ক্ষমতা দখল করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার রাজধানীর নাখালপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল কাদের মাসুমের মা আয়েশা আলী। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তখন ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল শেখ হাসিনা। এখন তার বেডের (বিছানা) ওপর স্থান পেয়েছে জুলাই শহীদদের নামের তালিকা।’ আয়েশা আলী বলেন, ‘হাসিনার পতন সবদিক থেকে হয়েছে। এই জাদুঘর দেখলে কেউ আর স্বৈরশাসক হওয়ার সাহস পাবে না।’
জুলাই যোদ্ধা হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ। তিনি গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই কারাবন্দী হয়েছিলেন। পরে ছাড়া পান ওই বছরের ৬ আগস্ট। আবু হানিফ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানে যে ঘটনাগুলো চাক্ষুষ মানুষের সামনে ঘটেছে তা জাদুঘরে নানাভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষের ওপর কীভাবে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে, তার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব দেখলে গণ-আন্দোলন নিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে।’
২০২৪ সালে ৫ আগস্ট হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে গণভবনে ঢুকে পড়েছিলেন আহমেদ শফিক শুভ (২১)। তিনি উদ্বোধনের দিনও জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে এসেছিলেন। নেত্রকোনার এই বাসিন্দা তখন গাজিপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তিনি নিজেকে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার সান্দিকোনা ইউনিয়নের ছাত্রদলের সদস্য বলে পরিচয় দেন। শুভ বলেন, ‘শেখ হাসিনা থাকাকালীন কাউকে এই এলাকায় ঘেঁষতে দিত না। এখন এই গণভবনই আমাদের আন্দোলনের স্মৃতি।’
তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব স্মৃতি এখনো এই জাদুঘরে স্থান পায়নি বলে জানিয়েছেন আমজনতার দলের সদস্যসচিব তারেক রহমান। তিনি জুলাই জাদুঘরের সামনে বলেন, আন্দোলনের অনেক স্মারক, স্মৃতিচিহ্ন এখনো জাদুঘরে স্থান পায়নি।
জানতে চাইলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এখনো জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে গণ-অভ্যুত্থান পুরোপুরি উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। জাদুঘরকে প্রতিনিয়ত আপডেট (হালনাগাদ) করা হবে।’ এই জাদুঘরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের নমুনা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।








