আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া ছয়টি জিপ গাড়ি ফেরত নিয়ে গেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কাজের সুবিধার জন্য এগুলো ফেরত চেয়ে চিঠি দিয়েছিল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। কিন্তু এলজিইডি দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলছেন, এখন নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হবে তাঁর সহকর্মীদের।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যবহারের জন্য প্রায় এক বছর আগে নিজেদের ছয়টি জিপ গাড়ি দিয়েছিল এলজিইডি। সেই গাড়িগুলো ফেরত চেয়ে গত ৪ জুন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি দেন। সেই চিঠিতে বলা হয়, সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় ২০১৯ সাল থেকে এলজিইডি নতুন গাড়ি কিনতে পারছে না। ফলে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় সূত্র জানায়, ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত গাড়ির ব্যবস্থা না থাকায় এলজিইডি চারটি জিপ চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এবং দুটি জিপ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। চিঠি পাঠানোর তিন দিন পর গত ৭ জুন সেই জিপ ছয়টি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এলজিইডি।
সেই গাড়িগুলো ফেরত চেয়ে সেদিনই এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে একটি চিঠি দেন চিফ প্রসিকিউটর। সেই চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত স্পর্শকাতর আদালত। এ আদালতে যেসব প্রসিকিউটর কাজ করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশি পাহারায় চলাফেরা করেন। মামলাসহ তদন্তকাজ পরিচালনার জন্য সারা দেশে তাঁদের যাতায়াত করতে হয়। সেই জিপ ছয়টি চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় ও তদন্ত সংস্থার তদন্ত-বিচার কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার স্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, জিপগুলো ছাড়া ট্রাইব্যুনালের মামলার তদন্ত কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং তার প্রভাব পড়বে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমে। এতে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রমের গতিশীলতা নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা রকম প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
আমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটরতাদের (এলজিইডি) গাড়ি তারা নিয়ে নিতেই পারে। যদি প্রসিকিউশনের দায়িত্ব বা কাজের ধরন বিবেচনা করে এলজিইডি গাড়ি দিলে ভালো, না দিলে কিছু করার নেই। নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়েই তাঁরা কাজ করবেনতাই আগের ছয়টির সঙ্গে আরও ছয়টি মিলিয়ে মোট ১২টি জিপ সরবরাহ করতে এলজিইডিকে অনুরোধ জানান চিফ প্রসিকিউটর।
এক সপ্তাহ পর এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী অপারগতা জানিয়ে চিঠি দেন প্রধান প্রসিকিউটরকে। ১৬ জুন পাঠানো সেই চিঠিতে বলা হয়, এলজিইডির নিজস্ব দাপ্তরিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের স্বার্থে এবং বিদ্যমান তীব্র যানবাহনসংকট বিবেচনায় ফেরত আনা জিপগুলো আবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে।
কারা গাড়িসুবিধা পান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে প্রসিকিউটরদের গাড়িসুবিধার বিষয়ে সরাসরি কিছু উল্লেখ নেই। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সময় বিষয়টি উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২০ জন প্রসিকিউটর রয়েছেন। আইন ও বিচার বিভাগের প্রসিকিউটরদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চিফ প্রসিকিউটরের পদমর্যাদা অ্যাটর্নি জেনারেলের সমান। চিফ প্রসিকিউটরের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অ্যাটর্নি জেনারেলের সমান পাবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যবহারের জন্য প্রায় এক বছর আগে নিজেদের ছয়টি জিপ গাড়ি দিয়েছিল এলজিইডি। সেগুলো গত ৭ জুন ফেরত নিয়ে গেছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় ২০১৯ সাল থেকে এলজিইডি নতুন গাড়ি কিনতে পারছে না। ফলে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, চিফ প্রসিকিউর আমিনুল ইসলাম গাড়িসুবিধা পাচ্ছেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রসিকিউটরদের মধ্যে দুজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল সমমর্যাদার। তাঁরা হলেন মো. মিজানুল ইসলাম ও মো. আবদুস সোবহান তরফদার। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল গাড়িসুবিধা পেয়ে থাকেন। মিজানুল ইসলাম ও সোবহান তরফদার তা পাচ্ছেন বলে জানায় চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাকি ১৭ জন প্রসিকিউটর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার। তাঁরা সরকারি গাড়িসুবিধা পাওয়ার অধিকারী নন।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যে জিপগুলো নিয়ে গেছে এলজিইডি, সেগুলো ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলরা ব্যবহার করতেন।
অধিকারী নন, এমন প্রসিকিউটরদের গাড়িসুবিধা কেন দিতে চান—এ প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রসিকিউটরদের মধ্যে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বা সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার যাঁরা, তাঁরা গাড়ির প্রাধিকারভুক্ত নন। কিন্তু ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলদের সঙ্গে প্রসিকিউটরদের মৌলিক পার্থক্য হলো প্রসিকিউটরদের নিরাপত্তাঝুঁকি থাকে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই গাড়িগুলো ব্যবহার করতে চাওয়া, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।
যে জিপগুলো নিয়ে গেছে এলজিইডি, সেগুলো ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলরা ব্যবহার করতেন। সেগুলো ফেরত চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন চিফ প্রসিকিউটর। কিন্তু এলজিইডি জানিয়েছে, এলজিইডির নিজস্ব দাপ্তরিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের স্বার্থে এবং বিদ্যমান তীব্র যানবাহনসংকট বিবেচনায় ফেরত আনা জিপগুলো আবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রসিকিউশন এখন কী করবে
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা চেয়েছিলেন—বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এলজিইডির গাড়িগুলো ব্যবহার করবেন।
প্রসিকিউটরদের গাড়ি না থাকার সমস্যা তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউটররা নিরাপত্তার জন্য গানম্যান (অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য) সুবিধা পান। গানম্যান পাওয়ার পর প্রসিকিউটর রিকশায় চললে বা বাসে করে চলাচল করলে তাঁদের আর নিরাপত্তা থাকে না।
এখন গাড়ি না পাওয়ায় কী করবেন—জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তাদের (এলজিইডি) গাড়ি তারা নিয়ে নিতেই পারে। যদি প্রসিকিউশনের দায়িত্ব বা কাজের ধরন বিবেচনা করে এলজিইডি গাড়ি দিলে ভালো, না দিলে কিছু করার নেই। নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়েই তাঁরা কাজ করবেন।








