আষাঢ়ের শেষ বিকেলে পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। গারো পাহাড়ের সবুজ ঢাল লাল আভায় আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই টুংটাং শব্দ তুলে পাহাড় বেয়ে নেমে আসতে থাকে গরুর পাল। গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে খামারিরা গুনে নেন নিজেদের গরু। দিনভর পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঘাস ও লতাপাতা খেয়ে সন্ধ্যার আগেই তাঁরা গরু নিয়ে ফিরে আসেন লোকালয়ে।

শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় এ দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশি গরু পালন করে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন সীমান্তবর্তী এলাকার খামারিরা। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় বদলে যাচ্ছে তাঁদের জীবনযাত্রা, ফিরছে সচ্ছলতা।

গত বৃহস্প‌তিবার বিকেলে ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্দিগাঁও গ্রামের খামারি হেলাল মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। প্রায় ২৩ বছর ধরে তিনি পাহাড়ে গরু পালন করছেন। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ২৭টি গরু, যার মধ্যে ১২টি বাছুর। হেলাল বলেন, ‘সকালে গরু পাহাড়ে ছেড়ে দিই, সন্ধ্যার আগে আবার নিয়ে আসি। শুধু লবণ-পানি দিই, আর কোনো খাবার লাগে না। একটা বাছুর ৪০ থেকে ৫০ হাজার, বড় গরু ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এতে ভালো লাভ হয়।’ তিনি জানান, গরু পালনই তাঁর পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। এই আয়ে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে, সন্তানদের লেখাপড়াও চালিয়ে নিতে পারছেন।

মা‌ঠে ঘাস খা‌চ্ছে গরুর পাল। বৃহস্প‌তিবার বি‌কে‌লে শেরপুরের শ্রীবরদীর বা‌লিজু‌ড়ি গ্রামে

দেড় শতাধিক খামারির ভরসা পাহাড়

শুধু হেলাল মিয়ার মতো শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দেড় শতাধিক খামারি একই পদ্ধতিতে দেশি গরু পালন করছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গারো পাহাড়ের বিস্তীর্ণ ঢালজুড়ে সারা বছরই প্রাকৃতিক ঘাস জন্মায়। গরুর খাদ্য কিনতে অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। এতে দেশি গরু পালন হয়ে উঠেছে সহজ ও লাভজনক।

গজনী এলাকার কৃষক হেরুত মারাক বলেন, ‘কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু পালন করি। সকালে পাহাড়ে ছেড়ে দিই, সন্ধ্যায় নিয়ে আসি। খরচ কম, লাভ ভালো। তবে মাঝে মাঝে বন্যহাতির ভয় থাকে, তাই পাহারা দিতে হয়।’

নালিতাবাড়ীর দাওধারা-কাটাবাড়ি গ্রামের খামারি হজরত আলীর খামারে রয়েছে ৩০টি গরু। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের ঘাসেই গরু ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। খাবারের খরচ নাই, রোগও কম হয়। বাজারে দেশি গরুর চাহিদা বেশি, তাই আমরা লাভবান হচ্ছি।’

শ্রীবরদীর বালিজুরি গ্রামের খামারি রফিকুল ইসলামের খামারে রয়েছে ৩৫টি গরু, যার মধ্যে ১৮টি গাভি। তিনি জানান, পাহাড়ে বেড়ে ওঠা দেশি গরুর মাংসের স্বাদ ভালো হওয়ায় বাজারে এসব গরুর চাহিদা তুলনামূলক বেশি।

শেষ বিকেলে ধুলা উড়িয়ে ঘরে ফিরছে গরুর পাল। বৃহস্প‌তিবার বি‌কে‌লে নালিতাবাড়ীর দাওধারা-কাটাবা‌ড়ি গ্রামে

পাহাড়কেন্দ্রিক নতুন অর্থনীতি

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাবেলাকোনা, হারিয়াকোনা, খাড়ামোড়া, বালিজুরি, গজনী, হালচাটি, নওকুচি, রাংটিয়া, সন্ধ্যাকুড়া, মধুটিলা, বারোমারি ও দাওধারা-কাটাবাড়িসহ ১৫টির বেশি গ্রামে এখন গরু পালনকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। কৃষ‌কদের ৮ থেকে ১৫টি গরু থাক‌লেও অনেকের খামারে ৬০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত গরু রয়েছে। এতে পাহাড়ি এলাকায় কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় দেশি গরুর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে বর্ষা মৌসুমে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দ্রুত চিকিৎসাসেবা না পাওয়া ও বন্য প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে গারো পাহাড়ে দেশি গরু পালন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এতে খামারিদের জীবনে স্বস্তি ফিরেছে, তাঁরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।