ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে একটি ছোট্ট মাটির গর্তই হয়ে উঠেছিল সার্হি ক্রিনিতস্কির ঘর, আশ্রয় এবং কখনো কখনো সমাধির মতো এক ভয়ংকর বাস্তবতা। প্রায় এক বছর ধরে সেই সংকীর্ণ বাংকারে লুকিয়ে জীবন কাটিয়েছেন ৪২ বছর বয়সী এই ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা। চারদিকে রুশ ড্রোনের অবিরাম নজরদারি, আকাশ থেকে বোমা হামলা, শত্রুসেনার অগ্রযাত্রা আর মৃত্যুর অপেক্ষা—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন।

বুধবার (২২ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ও ডায়েরিতে সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ ধরে রেখেছেন ক্রিনিতস্কি। যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি সেখানে ধরা পড়েছে একাকিত্ব, ক্ষুধা, ঠান্ডা, সহযোদ্ধার মৃত্যু এবং বেঁচে থাকার এক নির্মম সংগ্রাম।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁর একমাত্র সঙ্গী সহযোদ্ধা রক্তাক্ত অবস্থায় বাংকারের ভেতর পড়ে আছেন। ড্রোন থেকে ফেলা বোমার শার্পনেলে তাঁর পায়ের একটি ধমনি কেটে গিয়েছিল। ক্রিনিতস্কি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ কণ্ঠে বলেন, ‘সকালে একসঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করেছ। আর সন্ধ্যায় মনে হচ্ছে স্বর্গের দরজা ডাকছে।’

সেদিন ছিল তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানের ৩২৬ তম দিন।

ড্রোন যুদ্ধ ইউক্রেনের সম্মুখসমরের চেহারা আমূল বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে সেনা, ট্যাংক ও কামান একসঙ্গে বড় আকারের প্রতিরক্ষা লাইনে অবস্থান করত, এখন সেখানে ছোট ছোট দল ছড়িয়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। প্রায় ৩০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই অঞ্চলকে সেনারা বলেন ‘কিল জোন’—কারণ এখানে যে কোনো মুহূর্তে ড্রোনের নজরে পড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়।

ফলে মাত্র দুই-তিনজন সেনাকে নিয়ে গঠিত ছোট দলগুলো মাসের পর মাস মাটির নিচের গর্তে আটকে থাকে। এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে সেনা বদল করাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ক্রিনিতস্কির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।

তিনি ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চাসিভ ইয়ারের কাছে মোতায়েন ছিলেন। প্রায় ৩ মিটার বাই ৪ মিটার আয়তনের একটি মাটির গর্তে কাটিয়েছেন তাঁর যুদ্ধকালীন সময়ের অধিকাংশ। কখনো ড্রোনে বাংকার ধ্বংস হলে আবার নতুন করে মাটি খুঁড়ে আশ্রয় তৈরি করতে হয়েছে।

রয়টার্স তাঁর ২২টি ভিডিও পর্যালোচনা করেছে এবং যুদ্ধ শেষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে এই কাহিনি তৈরি করেছে। ক্রিনিতস্কির ৩৪৬ দিনের সামরিক দায়িত্বের প্রায় পুরো সময়ই কেটেছে সেই মাটির নিচের আশ্রয়ে। অসাধারণ সাহসিকতার জন্য পরে তিনি ইউক্রেনের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘হিরো অব ইউক্রেন’ পদকে ভূষিত হন।

প্রতি কয়েক দিন পরপরই ছোট ছোট দলে রুশ সেনারা এগিয়ে আসত। কখনো কখনো তারা ক্রিনিতস্কির কাছ থেকে মাত্র ২০ মিটার দূরত্বেও চলে আসত। ক্রিনিতস্কির দাবি, কাছাকাছি সংঘর্ষে তিনি ২৩ জন শত্রুসেনাকে হত্যা করেছেন। তাঁর ইউনিট, ২৪ তম মেকানাইজড ব্রিগেডও এই সংখ্যার কথা জানিয়েছে। তবে তাঁর বর্ণনার সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

যুদ্ধের আগে ক্রিনিতস্কি ছিলেন সাধারণ একজন মানুষ। কৃষি ও নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন। এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে এক মাস কোমায় থাকার পর জীবিকা হিসেবে খরগোশ পালন শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে পশ্চিম ইউক্রেনের বিলোহিরিয়া গ্রামের বাড়ি থেকে তাঁকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। দ্রুত প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় পূর্বাঞ্চলের রণক্ষেত্রে।

সেখানে বেঁচে থাকার জন্য তাঁকে অবলম্বন করতে হয়েছে অদ্ভুত সব কৌশল। কখনো তিন-চার দিন পর্যন্ত সরবরাহের ড্রোন পৌঁছাতে পারেনি। তখন নিহত রুশ সেনাদের কাছ থেকে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন তিনি। এমনকি মৃত সেনাদের কাছ থেকে পাওয়া সিগারেটও জমিয়েছেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায়—ক্যামেল, উইনস্টন, চেস্টারফিল্ডসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট তিনি এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছেন, যেভাবে কেউ ডাকটিকিট সংগ্রহ করে।

আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, কাদায় মাখা ১৩টি রাইফেল। গর্বের সঙ্গে তিনি সেগুলোকে নিজের ‘ছোট অস্ত্রাগার’ বলে দেখিয়েছেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ যুদ্ধযাত্রার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে ১১ মার্চ। ড্রোন হামলায় তাঁর সহযোদ্ধার পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। ক্রিনিতস্কি তাঁকে টেনে বাংকারে নিয়ে আসেন, কাপড় কেটে ক্ষতস্থানে টুর্নিকেট বাঁধেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান তাঁর সঙ্গী।

কমান্ড থেকে অবস্থান ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ আসে। সেই রাতে শেষবারের মতো বাংকার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন ক্রিনিতস্কি। আরও প্রায় তিন সপ্তাহ কয়েকজন সহযোদ্ধার সঙ্গে লুকিয়ে থাকার পর ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছান তিনি। পেছনে পড়ে থাকে সেই মানুষটির দেহ, যার সঙ্গে তিনি প্রায় এক বছর ধরে ভাগ করে নিয়েছিলেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, ক্ষুধা, ভয়, হাসি আর অসহায় অপেক্ষা।

যুদ্ধ শেষে ক্রামাতোরস্কে ফিরে এসেও অবশ্য যুদ্ধ তাঁকে ছাড়েনি। তাঁর হাত কাঁপে, চোখে পানি আসে। তিনি বলেন, ‘অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।’

তবু নিজের আত্মত্যাগকে অর্থহীন মনে করেন না ক্রিনিতস্কি। সম্প্রতি নিজ এলাকার স্কুলগুলোতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। শিশুদের মুখ দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এত কষ্ট সহ্য করা হয়তো বৃথা যায়নি। তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে বুঝেছি—আমি যে আমাদের দেশ আর এই শিশুদের জন্য লড়েছি, সেটা বৃথা যায়নি। তারা যেন পড়াশোনা করতে পারে, খোলা আকাশ দেখতে পারে।’