বিশ্বকাপে গ্রুপ ম্যাচে ঘানার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে ইংল্যান্ডের তারকা ফুটবলার হ্যারি কেইন গোল করার একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। তাঁর শটটি বারের ওপর দিয়ে গ্যালারিতে চলে যায়। তখন গ্যালারিতে থাকা এক ইংল্যান্ড সমর্থক পাশে বসা ঘানার সমর্থককে মজা করে বলেন, ‘তাহলে তো দেখা যাচ্ছে জাদু আসলেই কাজ করছে।’ ঘানার সমর্থক হেসে জবাব দেন, ‘আরে না, কোনো জাদু নয়, ওর আসলে আরও গোল করার অনুশীলন দরকার।’

এই মজার আলোচনার পেছনে একটি কারণ ছিল। ম্যাচের আগে নানা কোয়াকু বনসাম নামের ঘানার এক ওঝা দাবি করেছিলেন, তিনি কেইনের ওপর কালো জাদু করেছেন। ব্রিটিশ পত্রিকা ‘ডেইলি স্টার’কে বনসাম বলেছিলেন, তিনি হ্যারি কেইনকে আটকানোর জন্য কাজ করছেন। এর আগেও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ঘানার মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি দাবি করেছিলেন পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাঁটুতে তিনি জাদুর মাধ্যমে চোট তৈরি করেছেন। কেইনের ব্যাপারে ঘানার এই ওঝা বলেছিলেন, ‘আমি তাকে বড় কোনো আঘাত করতে চাই না। শুধু আমার দেশের বিরুদ্ধে যেন সে গোল করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করছি।’

নানা কোয়াকু বনসাম ঘানায় বেশ পরিচিত ও প্রভাবশালী একজন মানুষ। তিনি একবার দেশটির সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। আমেরিকার নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস এলাকায় বেশ কয়েক বছর থাকার সময় তিনি সেখানে বসবাসকারী ঘানার মানুষের মধ্যে নিজের বড় একটি অনুসারী দল তৈরি করেন। ঘানায় ফেরার পর কুমাসি বিমানবন্দরে শত শত মানুষ তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। বনসাম দামি ক্যাডিলাক গাড়ি চালান, পরেন দামি ব্র্যান্ডের পোশাক। এমনকি তিনি নিউইয়র্ক, আমস্টারডাম ও বার্লিনের মতো বড় বড় শহরেও থেকেছেন। এক দশক আগে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকা তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। প্রতিবেদনে বনসামকে একজন বিতর্কিত ঐতিহ্যবাহী পুরোহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

নরওয়ে গোল করলেই কেঁপে ওঠে একটি আস্ত শহর

ঘানার মানুষ জাদুটোনাকে বেশ গুরুত্ব দেয়। গ্যালারিতে খেলা দেখতে আসা ঘানার সমর্থক জোসেফ এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক মানুষ, এমনকি অনেক উচ্চশিক্ষিত লোকও এসব বিশ্বাস করে। আমাদের ফুটবল দল যখন খারাপ খেলে, তখন অনেকে মনে করে কেউ নিশ্চয়ই আমাদের ওপর কোনো জাদু করেছে। আবার যখন দল ভালো খেলে ও ম্যাচ জেতে, তখন অনেকে বলে আমরা জাদুর সাহায্য নিয়েছি বলে জিতেছি। তবে আমি এসব বিশ্বাস করি না এবং আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই এখন আর এসব বিশ্বাস করে না।’

ফুটবলে জাদুটোনার এই বিশ্বাস আফ্রিকায় এতটাই বেশি ছিল যে ফুটবল কর্তৃপক্ষকে এর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। আফ্রিকান টুর্নামেন্টগুলোতে ফুটবলারদের তাবিজ ব্যবহার, মাঠে একধরনের বিশেষ গুঁড়া ছিটানো এবং ওঝাদের নিয়ে আসার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে। এরপর ২০০৮ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন সরাসরি একটি বিবৃতি দেয়। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ফুটবল মাঠে ওঝাদের উপস্থিতি তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জাম্বিয়াসহ আফ্রিকার কিছু দেশ ফুটবলে এ ধরনের প্রথার ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

জাম্বিয়ার সাবেক ফুটবলার এনচিমুনিয়া মিতওয়া একবার বিবিসির কাছে ফুটবলে জাদুটোনা নিয়ে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, স্কুল ফুটবল দলে খেলার সময় তিনি প্রথম এ বিষয়ের মুখোমুখি হন। তাঁদের স্কুল দলে একজন ওঝা ছিলেন এবং খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করানো হতো যে ওঝার জাদুর জোরে তাঁরা ম্যাচ জিতবেন। এমনকি নিয়মিত অনুশীলনের পর সেই ওঝা সব খেলোয়াড়কে একধরনের জাদুর তেল শরীরে মাখার নির্দেশ দিতেন।

বার্সেলোনায় হেলিকপ্টার থেকে কবিতার বোমাবর্ষণ করেছেন একদল শিল্পী

২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) ফাইনালে মরক্কো ও সেনেগালের ম্যাচে জাদুটোনা নিয়ে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। পুরো ম্যাচে মরক্কোর বল বয় আর খেলোয়াড়েরা বারবার সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার মেন্ডির তোয়ালেটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হাত ভেজা থাকলে বল ধরতে সমস্যা হয়, তাই মেন্ডির জন্য তোয়ালেটি খুব দরকার ছিল। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে পরবর্তী সময়ে মরক্কোর একজন খেলোয়াড়কে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ এবং জরিমানা করে। অনেকে এটিকে কেবল খেলার একটি কৌশল মনে করলেও অনেকে এর পেছনে জাদুটোনার প্রভাব দেখেছিলেন। মরক্কোর সাবেক কোচ হার্ভে রেনার্ড পরে বলেন, ‘ইউরোপের মানুষ বোঝে না যে এর পেছনে অন্য কিছু আছে। তোয়ালেটাতে কি আসলেই কোনো জাদু ছিল? আফ্রিকায় মানুষ এগুলো বিশ্বাস করে।’

কাপ অব নেশনস ফাইনালে মরক্কো ও সেনেগালের মধ্যে ম্যাচে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়

এদিকে ইংল্যান্ড আর ঘানার ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধেও গ্যালারিতে দর্শকদের মধ্যে জাদুটোনা নিয়ে হাসিতামাশা চলছিল। তবে ম্যাচ শেষে ঘানার সেই ওঝা জানিয়েছেন, তিনি ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে তাঁর জাদু থেকে মুক্তি দিয়েছেন। বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হওয়ার পর তিনি এই ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে বনসাম বলেন, ‘এখন আমি হ্যারি কেইনকে মুক্তি দিতে যাচ্ছি, যাতে সে তার পরের ম্যাচে গোল করতে পারে। হ্যারি, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব। কিছু মনে করো না, আমরা এখন বন্ধু।’

ঠিক তার পরের ম্যাচে পানামাকে ২–০ গোলে হারিয়ে ‘এল’ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইংল্যান্ড। একটি গোলও করেছেন হ্যারি কেইন।

গোলের সুযোগ নষ্ট করার পর হতাশ ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন

অথচ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৪-২ গোলের ম্যাচে হ্যারি কেইন দুটি গোল করেছিলেন। কিন্তু ঘানার বিপক্ষে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার গোলপোস্টের খুব কাছ থেকে পাওয়া একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। এই গোলটি হলে ইংল্যান্ড ম্যাচটি জিতে নকআউট পর্বে যাওয়া নিশ্চিত করতে পারত।

তবে শেষ মুহূর্তের এই গোল মিস করা নিয়ে হ্যারি কেইন নিজে অবশ্য একদমই ভেঙে পড়েননি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমি মাঠে এই রকম একটি সুযোগের অপেক্ষা করছিলাম। সুযোগটি এসেছিল, কিন্তু আমি ঠিকমতো বলটি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারিনি। তবে আমি দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলছি ও আমি জানি সব ম্যাচে গোল পাওয়া যায় না।’

সূত্র: রয়টার্স, পিপলস ডটকম, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বিশ্বকাপের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাঁস